তারল্য সংকটে বাণিজ্যিক ব্যাংক

১৪ দিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা

রোহান রাজিব: কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ধার নেয়া বাড়িয়েছে। তারল্য সংকট মেটাতে ব্যাংকগুলো আন্তঃব্যাংকের পাশাশাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার করে চলছে। গত ১৪ দিনে এক লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার করেছে বাণিজ্যিক ব্যাংক। মূলত কিছু ব্যাংক এখনও তারল্য সংকটে ভুগছে। তাই সংকট মেটাতে নিয়মিত এসব ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, অনেক ব্যাংক নগদ টাকার সংকটে ভুগছে। সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো আন্তঃব্যাংকের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার নিয়ে চলছে। তবে কিছু ধার আছে একদিন মেয়াদি। অর্থাৎ আগের দিন ঋণ নিয়ে পরের দিন পরিশোধ করছে। এভাবে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত সাত কর্মদিবসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৭৩ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা ধার করে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ধার নিয়েছে ২৭ জুলাই ১৩ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা। গত ২৪ জুলাই ধারের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৪৭৫ কোটি, ২৫ জুলাই ১১ হাজার ৫২৬ কোটি, ২৬ জুলাই ১১ হাজার ৯২০ কোটি, ৩০ জুলাই ৫ হাজার ৮৫৪ কোটি, ৩১ জুলাই ৯ হাজার ৩৫৩ কোটি এবং সর্বশেষ গত ১ আগস্ট ১০ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার নিয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।

এর আগে গত ১৩ জুলাই থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত সময়ের সাত কর্মদিবসে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার নিয়েছে ৪২ হাজার ৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ধার নিয়েছে ১৮ জুলাইÑআট হাজার ৮৯ কোটি টাকা। ফলে ১৪ দিনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১৫ হাজার ৭২২ কোটি টাকা ধার করেছে।

এর মধ্যে কিছু অর্থ দেয়া হয়েছে একদিনের জন্য। কিছু তিন দিন, সাত দিন ও ১৪ দিন মেয়াদের জন্য। এজন্য ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সুদ গুনতে হয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ হারে।

সংশ্লিøষ্টরা জানান, কোনো ব্যাংক তারল্য সমস্যায় পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার নেয়। পাশাপাশি আন্তঃব্যাংক কলমানিতে আরেক ব্যাংক থেকে ধার করে। গত বৃহস্পতিবার কলমানিতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা। গত বুধবার ছিল ৮ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা। ডলার কেনার বিপরীতে পরিশোধ এবং আমানত প্রবৃদ্ধি কম থাকার কারণে কোনো কোনো ব্যাংকে টাকার চাহিদার তুলনায় নিজস্ব সরবরাহ কম রয়েছে। এ কারণে আন্তঃব্যাংকে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার নেয়া বেড়েছে।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, অনিয়মের ঘটনা আলোচনায় আসার পর গত নভেম্বর থেকে কয়েকটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক বড় ধরনের তারল্য সংকটে পড়ে। অনেকে এসব ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নেন, নতুন আমানত রাখাও কমে যায়। এর জের চলছে এখনও। তাতে পুরো ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট না থাকলেও শরিয়াহভিত্তিক ও প্রচলিত ধারার কিছু ব্যাংক এখনও সংকটে রয়েছে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব ব্যাংককে রেপো, বিশেষ রেপো ও বিশেষ তহবিল সুবিধার আওতায় টাকার জোগান দিয়ে ব্যাংক খাতের আস্থা ধরে রাখার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে।

জানা যায়, এখনও সাত থেকে আটটি ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিআরআর ও এসএলআরের টাকা জমা রাখতে পারছে না। তাই এসব ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার করে সিআরআর ও এসএলআরের টাকাও জমা রাখছে।

জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেসরকারি খাতের একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেয়ার বিজকে বলেন, অনিয়মের মাধ্যমে বেশ কিছু ব্যাংক থেকে ঋণ বেরিয়ে গেছে। অনিয়মের খবর প্রকাশ পেলে এসব ব্যাংকের আমানতকারীরা তাদের আমানত তুলে ফেলেন। ফলে ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে ভুগতে থাকে। এখনও সেই পরিস্থিতি চলমান। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার করে চলতে হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া ব্যাংকগুলোর সংকট আরও বাড়িয়ে দেবে। কারণ এতে ব্যাংকগুলোর আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সক্ষমতা কমে যাবে। তাই ব্যাংকগুলোকে নিজ উদ্যোগে আমানত সংগ্রহে মনোযোগী হতে হবে। কমাতে হবে তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়।

জানা গেছে, সংকট দেখা দিলে ব্যাংকগুলো আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার থেকে ধার নিয়ে থাকে। তবে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে পর্যাপ্ত জোগান না থাকলে কলমানি মার্কেটে সুদহার বেড়ে যায়। এতে মুদ্রাবাজারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। গ্রাহকও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। দেখা দেয় আস্থার সংকট। এমনি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করে আর্থিক বাজার স্থিতিশীল রাখে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোকে টাকার জোগান দিয়ে থাকে। বিশেষ করে ঈদকেন্দ্রিক লেনদেনে বাংলাদেশ ব্যাংক সহযোগিতা করে বেশি। কিন্তু কাক্সিক্ষত হারে আমানত সংগ্রহ হচ্ছে না। প্রকৃত আমানত আসছে কম। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে যে টাকার জোগান দেয়া হচ্ছে, তাও আমানাত হিসেবে দেখাচ্ছে কিছু ব্যাংক। এতে আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ শতাংশের কিছু ওপরে। তবে ৬ শতাংশ গড় আমানতের সুদহার বছর শেষে যুক্ত হলে প্রকৃত আমানত হবে আরও কম। এ কারণে ব্যাংকগুলোয় টাকার সংকট দেখা দিয়েছে। এ সংকট মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিদিন রেপো, বিশেষ রেপো ও বিশেষ তারল্য সহায়তার আওতায় ব্যাংকগুলোকে টাকার জোগান দিয়ে আসছে।