Print Date & Time : 24 May 2026 Sunday 3:14 am

২০১৭ সালে বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ বেড়েছে ২৪%

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০১৬ সালে বেসরকারি খাতে বিদেশি বাণিজ্যিক ঋণ ছিল ৯২৫ কোটি তিন লাখ ডলার। ২০১৭ সালে তা বেড়ে হয়েছে এক হাজার ১৩৪ কোটি ১২ ডলার। অর্থাৎ এক বছরে বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ বেড়েছে ২৪ শতাংশ। আর ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চার বছরে এ ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১৮৩ শতাংশ। এমন তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণা প্রতিবেদনে।
এতে বলা হয়, দেশের বেসরকারি খাতে বিদেশি বাণিজ্যিক ঋণ বৃদ্ধির ফলে তা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। গতকাল রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত বিআইবিএমের মিলনায়তনে ‘প্রাইভেট কমার্শিয়াল বোরোয়িং ফ্রম ফরেন সোর্সেস ইন বাংলাদেশ: এন অ্যানাটমি’ শীর্ষক সেমিনারে ওই গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন বিআইবিএমের পরিচালক ড. প্রশান্ত কুমার ব্যানার্জী। এতে বলা হয়, ২০০৬ সালে সরকারি খাতে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৭৮০ কোটি ডলার, যা ছিল মোট বিদেশি ঋণের ৯৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ। একই সময় বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ১১ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা মোট বিদেশি ঋণের মাত্র ছয় দশমিক এক দুই শতাংশ।
এরপর ধীরে ধীরে সরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ বাড়লেও তার গতি ছিল ধীর। আর বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ বেড়েছে দ্রুত হারে। ২০১৭ সালে এসে মোট বিদেশি ঋণের ৭৫ দশমিক ৭২ শতাংশ হয় সরকারি খাতে আর বাকি ২৪ দশমিক ২৮ শতাংশ হয় বেসরকারি খাতে।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান বলেন, ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বেসরকারি ঋণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। তবে দেখা যাচ্ছে, সবাই এটির সঠিক ব্যবহার করছে না।
কেউ কেউ বিদেশি ঋণ নিয়ে তা বিনিয়োগ না করে ব্যাংকে জমা রাখছে। তারা এটার অপব্যবহার করছে।
তিনি আরও বলেন, বিদেশি ঋণের অপব্যবহার রোধ করতে হবে। অনেক দেশকেই বিদেশি ঋণ নিয়ে বিপাকে পড়তে দেখা গেছে। বাংলাদেশে এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিষয়টিতে সজাগ রয়েছে।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বিআইবিএমের মুজাফফর আহমেদ চেয়ারের অধ্যাপক ড. বরকত-এ-খোদা, সোনালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক অধ্যাপক এস এ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অতিরিক্ত সচিব এবং বিডা’র নির্বাহী কমিটির সদস্য নাভাস চন্দ্র মণ্ডল, ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহবুল-উল-আলম এবং বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী।
আলোচকরা বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণের বৃদ্ধিকে নেতিবাচকভাবে উল্লেখ করেন। বলেন, অনেক ব্যবসায়ী বিদেশি ঋণ এনে তা বিনিয়োগে না ব্যবহার করে ব্যাংকে জমা রাখছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালে বেসরকারি খাতের স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের পরিমাণ হয় ৮৪৫ কোটি ডলার যেখানে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি ঋণের পরিমাণ ২৯২ কোটি টাকা। বিষয়টি নিয়ে সেমিনারে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বলা হয়, স্বল্পমেয়াদি ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ ব্যবসায়ীরা স্বল্পমেয়াদি ঋণ এনে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বিনিয়োগ করে।
বিআইবিএমের অধ্যাপক ড. বরকত-এ-খোদা বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বর্তমানে বিদেশি বাণিজ্যিক ঋণের দরকার আছে। তবে কেউ যেন এর অপব্যবহার করতে না পারে তা বাংলাদেশ ব্যাংককেই দেখতে হবে।
ওই প্রতিবেদনে বিদেশি বাণিজ্যিক ঋণের বিষয়ে ১১ ধরনের উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করা হয়। বলা হয় দিনদিনই বিদেশি ঋণের ঝুঁকি বাড়ছে, সেইসঙ্গে ঋণের খরচও বাড়ছে। খাত অনুযায়ী বিদেশি ঋণের পরিমাণও উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, ঋণের ২৪ শতাংশই এসেছে পোশাক খাতে, এরপর বিদ্যুতে ২১ শতাংশ, সুয়েটারে ১৬ শতাংশ, ডায়িং ও নিট গার্মেন্টে ১২ শতাংশ এবং টেক্সটাইলে আসে ১২ শতাংশ বিদেশি ঋণ।
বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, বন্ড মার্কেট ডেভেলপ করলে তারল্য সংকট থাকবে না। এজন্য সরকারি বন্ড ডেভেলপ করা জরুরি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট থাকবে না।
ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব-উল-আলম বলেন, আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের দিকে যাচ্ছি। ফলে সামনের দিনে আমরা বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা হারাব। তাই আমাদের দেশের ভেতরেই অর্থের উৎস বাড়াতে হবে। বিকল্প চিন্তা করতে হবে। এসব বিষয় নিয়ে বেশি বেশি গবেষণার প্রয়োজন আছে।