গ্যাসের নামে বাতাস বিক্রি

৩ কোম্পানির ২ বছরে বাড়তি বিল আদায় ১৬৯ কোটি টাকা!

ইসমাইল আলী: দেশে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের দায়িত্ব পেট্রোবাংলার। বিভিন্ন গ্যাস ক্ষেত্র থেকে সংগ্রহ করে জিটিসিএলের (গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড) মাধ্যমে তা যায় বিতরণকারী কোম্পানিগুলোর কাছে। তারা সে গ্যাস সরবরাহ করে গ্রাহকদের। এতে বিতরণ লাইনের সমস্যা থাকলে গ্যাস কিছুটা অপচয় (সিস্টেম লস) হওয়ার কথা। তাই স্বাভাবিকভাবেই কেনার চেয়ে গ্যাস বিক্রির পরিমাণ কম হওয়ার কথা। যদিও বাস্তবে ঘটেছে তার উল্টো। কেনার চেয়ে বেশি গ্যাস বিক্রি করেছে বিতরণকারী তিন কোম্পানি।

গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ওপর সম্প্রতি অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে এ তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি কমিটি তাদের বিশ্লেষণে এ তথ্য তুলে ধরে। যদিও বিষয়টি নিয়ে বিস্ময় বলে মনে করছে কমিশন। আর সিস্টেম গেইনের নামের জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে বলে মনে করছে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।

বিইআরসির কারিগরি কমিটির বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে গ্যাস বিতরণে শীর্ষে রয়েছে তিতাস। এরপর রয়েছে জালালাবাদ ও কর্ণফুলী। পরের তিনটি অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে বাখরাবাদ, পশ্চিমাঞ্চল ও সুন্দরবন। এর মধ্যে সিস্টেম লসে রয়েছে তিতাস, জালালাবাদ ও পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি। আর সিস্টেম গেইনে রয়েছে বাখরাবাদ, কর্ণফুলী ও সুন্দরবন। অর্থাৎ ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে কেনার চেয়ে বেশি গ্যাস বিক্রি করেছে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ও কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। এর পরিমাণ প্রায় ১৭ কোটি ৪৫ লাখ ঘনমিটার। এর মাধ্যমে তিন বিতরণকারী কোম্পানি দুই বছরে জনগণের কাছ থেকে অতিরিক্ত বিল আদায় করেছে ১৬৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা।

তথ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছর জিটিসিএল থেকে ৯৩ কোটি ৫৮ লাখ ঘনমিটার গ্যাস কেনে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি। সে অর্থবছর কোম্পানিটির গ্যাস বিক্রির পরিমাণ ছিল ৯৫ কোটি ৬০ লাখ ঘনমিটার। অর্থাৎ ওই অর্থবছর দুই কোটি দুই লাখ ঘনমিটার গ্যাস অতিরিক্ত বিক্রি করে সুন্দরবন। এর মাধ্যমে গ্রাহক থেকে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল আদায় করে কোম্পানিটি।

পরের (২০২০-২১) অর্থবছর জিটিসিএল থেকে ৯৪ কোটি ১৮ লাখ ঘনমিটার গ্যাস কেনে সুন্দরবন। সে অর্থবছর কোম্পানিটির গ্যাস বিক্রির পরিমাণ ছিল ৯৫ কোটি ২৫ লাখ ঘনমিটার। অর্থাৎ ওই অর্থবছর এক কোটি সাত লাখ ঘনমিটার গ্যাস অতিরিক্ত বিক্রি করে সুন্দরবন। এর মাধ্যমে গ্রাহকদের থেকে ১০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল আদায় করে কোম্পানিটি।

একইভাবে ২০১৯-২০ অর্থবছর জিটিসিএল থেকে ৩২৯ কোটি ৬৫ লাখ ঘনমিটার গ্যাস কেনে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। সে অর্থবছর কোম্পানিটির গ্যাস বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৩৩ কোটি ঘনমিটার। অর্থাৎ ওই অর্থবছর তিন কোটি ৩৫ লাখ ঘনমিটার গ্যাস অতিরিক্ত বিক্রি করে বাখরাবাদ। এর মাধ্যমে গ্রাহক থেকে ৩২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল আদায় করে কোম্পানিটি।

পরের (২০২০-২১) অর্থবছর জিটিসিএল থেকে ৩১৯ কোটি ৬৯ লাখ ঘনমিটার গ্যাস কেনে বাখরাবাদ। সে অর্থবছর কোম্পানিটির গ্যাস বিক্রির পরিমাণ ছিল ৩২২ কোটি ৩৫ লাখ ঘনমিটার। অর্থাৎ ওই অর্থবছর দুই কোটি ৬৫ লাখ ঘনমিটার গ্যাস অতিরিক্ত বিক্রি করে বাখরাবাদ। এর মাধ্যমে গ্রাহকদের থেকে ২৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল আদায় করে কোম্পানিটি।

এদিকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিটিসিএল থেকে ৩২৩ কোটি ৭৫ লাখ ঘনমিটার গ্যাস কেনে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। সে অর্থবছর কোম্পানিটির গ্যাস বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩২৭ কোটি ২৫ লাখ ঘনমিটার। অর্থাৎ ওই অর্থবছর তিন কোটি ৫০ লাখ ঘনমিটার গ্যাস অতিরিক্ত বিক্রি করে কর্ণফুলী। এর মাধ্যমে গ্রাহক থেকে ৩৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল আদায় করে কোম্পানিটি।

পরের (২০২০-২১) অর্থবছর জিটিসিএল থেকে ৩১৪ কোটি ১৩ লাখ ঘনমিটার গ্যাস কেনে বাখরাবাদ। সে অর্থবছর কোম্পানিটির গ্যাস বিক্রির পরিমাণ ছিল ৩১৮ কোটি ৯৯ লাখ ঘনমিটার। অর্থাৎ ওই অর্থবছর চার কোটি ৮৬ লাখ ঘনমিটার গ্যাস অতিরিক্ত বিক্রি করে বাখরাবাদ। এর মাধ্যমে গ্রাহকদের থেকে ৪৭ কোটি ১৩ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল আদায় করে কোম্পানিটি।

যদিও বিইআরসির কারিগরি কমিটির এ তথ্য সঠিক নয় বলে শুনানিতে দাবি করেন বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা। তবে কারিগরি কমিটি এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ করে জানায়, বিতরণকারী কোম্পানিগুলোকে গ্যাস সরবরাহ করে জিটিসিএল। তাই জিটিসিএলের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন থেকে প্রতিটি কোম্পানির গ্যাস কেনার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে গণশুনানিতে বিইআরসির চেয়ারম্যান আবদুল জলিল বলেন, গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো সিস্টেম গেইলে কীভাবে রয়েছে, বিষয়টি বিস্ময়কর। পোস্ট হেয়ারিংয়ে (গণশুনানি-পরবর্তী শুনানি) এ বিষয়ে কোম্পানিগুলোর ব্যাখ্যা শোনা হবে। তবে গ্যাস বিক্রির ক্ষেত্রে এ ধরনের অনিয়ম গ্রহণযোগ্য নয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত আবাসিকের মিটারবিহীন গ্রাহকদের ঠকানোর মাধ্যমে সিস্টেম গেইন করে থাকে কোম্পানিগুলো। কারণ মিটারবিহীন এক চুলায় মাসে ৭৩ ঘনমিটার ও দুই চুলায় ৭৭ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করা হয় বলে ধরা হয়েছে। এর ভিত্তিতে মাসিক ৯২৫ ও ৯৭৫ টাকা বিল আদায় করা হয়। যদিও মিটারযুক্ত চুলায় মাসে ৫০ মিটারের বেশি গ্যাস কখনোই ব্যবহার করা হয় না। এছাড়া আবাসিকে প্রায় সারা বছরই গ্যাস সরবরাহ সংকট থাকে। আর এ গ্যাস অন্য খাতে সরবরাহ করে বাড়তি বিল আদায় করে কোম্পানিগুলো।

তারা আরও জানান, বাকি তিন বিতরণকারী কোম্পানিও আবাসিক গ্রাহকদের ঠকিয়ে থাকে। তবে তাদের সিস্টেম লস অনেক বেশি। তবে আবাসিকের সেই বাড়তি গ্যাস দিয়ে তাদের সিস্টেম লস কমিয়ে দেখানো হয়। যেমন ২০১৯-২০ অর্থবছরে তিতাসের সিস্টেম লস ছিল ১৪ শতাংশ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৩ শতাংশ। তবে তারা সিস্টেম লস দুই শতাংশ দেখিয়েছে। মূলত আবাসিকের সেই বাড়তি গ্যাস দিয়েই সিস্টেম লস পুষিয়ে নিয়েছে কোম্পানিটি। বাকি দুই কোম্পানির ক্ষেত্রেও চিত্র একই হবে।

এ বিষয়ে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, সিস্টেম গেইনের নামে গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করছে কোম্পানিগুলো। একদিকে তারা বৈধ গ্রাহকদের ঠিকমতো গ্যাস সরবরাহ না করেই বিল নিচ্ছে, অন্যদিকে তারা অতিরিক্ত গ্যাস বিক্রি করে বাড়তি বিল আদায় করছে। এর মাধ্যমে ঠকানো হচ্ছে, যা বন্ধ করা উচিত। এজন্য আবাসিকে মিটারযুক্ত চুলা শতভাগ চালু করা উচিত।