রহমত রহমান: আমদানিতে ঘোষণা দেয়া হয়েছে ‘পুরোনো মোটর পার্টস ও ইঞ্জিন’। অথচ আমদানি হয়েছে বিলাসবহুল টয়োটা লেক্সাস গাড়ি। সিকেডি (বিযুক্ত) অবস্থায় পার্টস আকারে প্রায় ৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকার আস্ত এ গাড়ি আমদানি হয়েছে। একটি ওয়ার্কশপ থেকে আটক করা হলেও তারা দায় চাপিয়েছে আরেকটি ওয়ার্কশপের ওপর। যদিও ওয়ার্কশপ কোনো গাড়ি আমদানি করতে পারে না। তবে ছয় বছরেও এই গাড়ির দাবিদার পাওয়া যায়নি। অবশেষে গাড়িটি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তবে মোটর পার্টস ও ইঞ্জিন ঘোষণায় বিলাসবহুল গাড়ি কীভাবে, কারা আমদানি করেছেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একটি সূত্র বলছে, কাস্টমসের সহযোগিতায় একটি চক্র বিলাসবহুল এই গাড়ি পার্টস আকারে আমদানি করেছে। চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে পার্টস ঘোষণায় সিকেডি অবস্থায় গাড়ি নিয়ে এসে দেশে সংযোজন করছে। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।
এনবিআর সূত্রমতে, কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই জমজম অটো সার্ভিস নামে একটি ওয়ার্কশপে অভিযান পরিচালনা করেন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে প্রগতি সরণি বারিধারার এ ওয়ার্কশপ থেকে টয়োটা লেক্সাস এলএক্স ৪৭০ গাড়িটি আটক করা হয়। জমজম অটো সার্ভিস জমজম গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান। আটক করা ৪৬৬৩ সিসির গাড়িটি ২০০৫ সালে তৈরি। কর্মকর্তাদের কাছে গোপন সংবাদ ছিল, গাড়িটি পার্টস ও ইঞ্জিন ঘোষণায় আমদানি করা। গাড়িটির সে সময় বাজারমূল্য ছিল ৫৪ লাখ ৫৯ হাজার ৬৫৯ টাকা। যাতে প্রযোজ্য শুল্ককর ছিল ৪ কোটি ৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩২৭ টাকা। ওই বছরের ১৩ আগস্ট কাস্টমস গোয়েন্দার সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার একেএম নুরুল হুদা আজাদ বিচারাদেশ দিয়েছেন। যাতে গাড়িটির কোনো দাবিদার না থাকায় রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
মামলা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কাস্টমস গোয়েন্দা গাড়িটি আটকের পর জমজম অটো সার্ভিসের কাছে গাড়ির আমদানির দলিলাদি ও কাগজপত্র চেয়েছে। ওয়ার্কশপের কর্মীরা কোনো দলিলাদি দিতে পারেননি। পরে ওর্য়াকশপের সেই সময়ের ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) মো. সোহেল গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একটি লিখিত বিবৃতি দেন। যাতে উল্লেখ করেন, ২০১৮ সালের ১৮ জুলাই মোবারক হোসেন মাসুদ নামে এক ব্যক্তি তাদেরকে টয়োটা লেক্সাস জিপ গাড়িটি তৈরির জন্য ইঞ্জিনসহ যন্ত্রাংশ দিয়েছেন। মোবারক হোসেন মাসুদ তাদের জানিয়েছেন, ঢাকার রায়েরবাজার এলাকার এন আর জাপান অটো নামে একটি ওয়ার্কশপের কাছ থেকে তিনি এই ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ নিয়ে এসেছেন। এন আর জাপান অটো একটি গাড়ি তৈরির ওয়ার্কশপ। এছাড়া তারা গাড়ির যন্ত্রাংশ ও ইঞ্জিন আমদানি করে থাকে। ব্যবস্থাপক সোহেল গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ২০১৮ সালের ১২ জুলাইয়ে এর এন আর জাপান অটোর একটি বিল অব এন্ট্রি দেন। ওই বিল অব এন্ট্রিতে দেখা গেছে, পানগাঁও কাস্টম হাউসের মাধ্যমে এন আর জাপান অটো জাপানের এন আর জাপান কোং লিমিটেডের কাছ থেকে গাড়ির বিভিন্ন ইঞ্জিন ও পার্টস আমদানি করেছে। তবে টয়োটা লেক্সাস গাড়ির ইঞ্জিন ও পার্টসের সঙ্গে ওই বিল অব এন্ট্রিতে আমদানি করা ইঞ্জিন ও পার্টসের কোনো মিল খুঁজে পাননি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
সোহেল আরও জানান, জমজম অটো এন আর জাপান অটোর কাছ থেকে এই গাড়ির ইঞ্জিন ও পার্টস সংগ্রহ করেছে। গাড়িটি এন আর জাপান অটো প্রস্তুত করে তাদের সরবরাহ করেছে। তবে সোহেলের দেয়া বিবৃতি ও তথ্যের যথেষ্ট গরমিল রয়েছে।
সূত্রমতে, কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা টয়োটা লেক্সাস জিপ গাড়ির সঙ্গে থাকা একটি নেমপ্লেট ধরে অনুসন্ধান শুরু করেন। ওই নেমপ্লেটে থাকা নাম্বার ইন্টারনেটে যাচাইয়ে দেখা গেছে, গাড়িটি ২০০৫ সালে তৈরি। টয়োটা লেক্সাস এলএক্স ৪৭০ মডেলের গাড়িটির মূল্য ৬৫ হাজার ২২৫ ডলার, যা বাংলাদেশি ৫৪ লাখ ৫৯ হাজার ৬৫৯ টাকা। মডেল অনুযায়ী ওই গাড়িতে প্রযোজ্য শুল্ককর ৪ কোটি ৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩২৭ টাকা। কাস্টমস গোয়েন্দা গাড়িটির বিষয়ে জানতে এন আর জাপান অটোকে ২০১৮ সালের ১৮ নভেম্বর কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করে। তবে ওই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, টয়োটা লেক্সাস গাড়িটি সম্পর্কে তারা অবগত নয়। এছাড়া তারা গাড়িটি আমদানি করেনি। এন আর অটো সার্ভিস পানগাঁও কাস্টম হাউসে যে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে, তাতে চালানটি খালাসের দায়িত্বে ছিল চট্টগ্রামের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এসএম ট্রেড ইন্টান্যাশনাল। ওই চালানে টয়োটা লেক্সাস গাড়ির ইঞ্জিন ও পার্টস আমদানি হয়েছে কি নাÑতা জানতে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে বারবার চিঠি দেয়া হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে কোনো জবাব দেয়া হয়নি। এছাড়া জমজম অটোকে মালিকানা বিষয়ে জানতে চিঠি দেয়া হলেও কোনো জবাব দেয়নি।
সূত্রমতে, জমজম অটো সার্ভিস যে মোবারক হোসেন মাসুদের নাম বলেছে, তদন্তে সেই মাসুদের আর কোনো কূলকিনারা পায়নি কাস্টমস গোয়েন্দা। ধারণা করা হচ্ছে, মিথ্যা ঘোষণায় ইঞ্জিন ও পার্টস ঘোষণায় বিলাসবহুল গাড়ি (সিকেডি অবস্থায়) চক্রের সদস্য তিনি।
এনবিআর সূত্রমতে, যে ওয়ার্কশপ থেকে গাড়িটি আমদানি করা হয়েছে, তারা গাড়িটির মালিকানা দাবি করেনি। এমনকি রহস্যজনক কারণে ওই ওয়ার্কশপের কর্মকর্তারা কাস্টমস গোয়েন্দাকে আর কোনো সহযোগিতা করেনি। এন আর জাপান অটোও গাড়িটির মালিকানা দাবি করেনি। গাড়িটি কারা, কীভাবে আমদানি করেছে, সে বিষয়ে এন আর জাপান অটোর কর্মকর্তারাও কাস্টমস গোয়েন্দাকে কোনো তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেননি। আমদানিনীতি আদেশ ২০১৫-২০১৮ অনুযায়ী পাঁচ বছরের পুরোনো গাড়ি আমদানি নিষিদ্ধ। আর গাড়িটি অসত্য বা মিথ্যা ঘোষণায় ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ আকারে আমদানি হয়েছে, যা আমদানিনীতি আদেশের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। গাড়িটি চোরাচালানের মাধ্যমে আমদানি হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। কোনো পক্ষ গাড়িটির মালিকানা দাবি না করায় বিচারাদেশ শেষে আইন অনুযায়ী গাড়িটি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেয় ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার।
কাস্টমস গোয়েন্দার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেয়ার বিজকে জানিয়েছেন, পুরোনো পার্টস ও ইঞ্জিন ঘোষণায় আস্ত গাড়ি আমদানি করা হয়েছে। জমজম অটো বা এন আর জাপান অটোÑএই দুই প্রতিষ্ঠানের যে কেউ যন্ত্রাংশ আকারেই গাড়িটি আমদানি করেছে। রহস্যজনক কারণে তারা তা স্বীকার করেনি। তবে কাস্টম হাউসের বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত। আরও কোনো প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিন আর যন্ত্রাংশ ঘোষণায় এভাবে বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি করে কি নাÑতাও কাস্টম হাউসের দেখা উচিত।
অপরদিকে, টয়োটা লেক্সাস গাড়িটি আমদানির বিষয় অস্বীকার করেছেন এন আর জাপান অটোর মালিক ফেরদৌস আলম রাজু। তিনি বলেন, আমরা জাপান থেকে পুরোনো গাড়ির ইঞ্জিন ও পার্টস আমদানি করে দোলাইখাল এলাকায় বিক্রি করে দিই। টয়োটা লেক্সাস গাড়ির ইঞ্জিন ও পার্টস আমরা আমদানি করিনি। গাড়িটি আমাদেরও নয়।
তিনি আরও বলেন, ইঞ্জিনের দাম ও শিপিং চার্জ বেড়ে যাওয়ায় আমরা পোষাতে পারি না। সে জন্য ২০২০ সালে ওয়ার্কশপ বন্ধ করে দিয়েছি।
জমজম অটো সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা বলেন, এই ওয়ার্কশপ অনেকদিন বন্ধ ছিল। ২০১৮ সালে যারা দায়িত্বে ছিল তারা কেউ নেই। সে জন্য আমি বিষয়টি বলতে পারব না।