নিজস্ব প্রতিবেদক: জুলাইজুড়ে আন্দোলন ও আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। তবে এর প্রভাব পড়েছে দেশে মোবাইল ও ইন্টারনেট গ্রাহকের ওপর। অনেক আওয়ামী লীগে নেতাকর্মী ফোন বন্ধ করে গা-ঢাকা দিয়েছেন। অনেকে ভয়ে দেশ ছেড়েছেন। ফলে গত বছর জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে মোবাইল ফোনের গ্রাহক তথা সিম বন্ধ হয়েছে ৮৫ লাখ। এ সময়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কমেছে এক কোটি ১১ লাখ।
যদিও এ সময় আইএসপি ও পিএসটিএন তথা ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট গ্রাহক বেড়েছে ১০ লাখ। অর্থাৎ মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কমেছে এক কোটি ২১ লাখ। আর মোবাইল ফোন গ্রাহক সবচেয়ে বেশি কমেছে বাংলালিংকের। পরের দুটি অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে রবি আজিয়াটা ও গ্রামীণফোন। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটকের গ্রাহক অপরিবর্তিত রয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্যমতে, জুন মাস শেষে দেশে মোবাইল ফোন গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ১৯ কোটি ৬০ লাখ ৮০ হাজার। এক মাস পর জুলাই শেষে তা কমে দাঁড়ায় ১৯ কোটি ৪২ লাখ ৬০ হাজার। ডিসেম্বর শেষে এ গ্রাহক দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ কোটি ৭৫ লাখ ৮০ হাজার। অর্থাৎ ছয় মাসে দেশে ৮৫ লাখ সিম বন্ধ হয়েছে। এদিকে জুন শেষে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ১৪ কোটি ২১ লাখ ৭০ হাজার। জুলাই শেষে তা কমে দাঁড়ায় ১৪ কোটি ১০ লাখ ৫০ হাজার। আর ডিসেম্বরে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ১১ লাখে।
গেল ছয় মাসে দেশের বহুজাতিক মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের গ্রাহক কমেছে ১০ লাখ ১০ হাজার, রবি আজিয়াটার গ্রাহক কমেছে প্রায় ২৭ লাখ ৮০ হাজার ও বাংলালিংকের গ্রাহক কমেছে প্রায় ৪৫ লাখ ১০ হাজার। যদিও অপারেটরগুলো বলছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা নয় বরং মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির কারণে অনেকে মোবাইল ফোনের একাধিক সিম বন্ধ করে দিয়েছেন। এতে গ্রাহকও কমে গেছে।
যদিও সংশ্লিষ্টরা জানান, জুলাইয়ে কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরুর পর থেকে হঠাৎ করে মোবাইল গ্রাহক কমতে শুরু করে। মূল্যস্ফীতি বা ভ্যাট বৃদ্ধির প্রভাবে যতটা না গ্রাহক কমছে তার থেকে বেশি কমেছে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরুর পর। তবে পটপরিবর্তন বা সরকার পতনের প্রভাব এ খাতে অনেক বেশি পড়ছে। অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা একাধিক সিম ব্যবহার করতেন, যারা এখন পলাতক বা দেশের বাইরে। ফলে সিম বন্ধ করেছেন।
বিটিআরসি’র তথ্যমতে, আগস্ট মাস শেষে দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমে দাঁড়ায় প্রায় ১৯ কোটি ২৪ লাখ ৩০ হাজার, সেপ্টেম্বর শেষে ১৯ কোটি ৮ লাখ ৬০ হাজার, অক্টোবর শেষে ১৮ কোটি ৯৯ লাখ ৬০ হাজার ও নভেম্বর শেষে ১৮ কোটি ৮৭ লাখ ৮০ হাজার। আর আগস্ট মাস শেষে দেশে ইন্টারনেট গ্রাহক কমে দাঁড়ায় প্রায় ১৪ কোটি পাঁচ লাখ, সেপ্টেম্বর শেষে ১৩ কোটি ৮৬ লাখ ২০ হাজার, অক্টোবর শেষে ১৩ কোটি ৭১ লাখ ৮০ হাজার ও নভেম্বর শেষে ১৩ কোটি ২৮ লাখ।
২০২৪ সালের জুন শেষে গ্রামীণফোনের গ্রাহক ছিল প্রায় আট কোটি ৫৫ লাখ ৩০ হাজার, রবি আজিয়াটার গ্রাহক ছিল প্রায় পাঁচ কোটি ৯৫ লাখ ১০ হাজার, বাংলালিংকের গ্রাহক ছিল প্রায় ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮০ হাজার এবং রাষ্ট্রীয় অপারেটর টেলিটকের মোবাইল গ্রাহক ছিল প্রায় ৬৫ লাখ ৫০ হাজার।
ডিসেম্বর শেষে গ্রামীণফোনের গ্রাহক কমে দাঁড়ায় প্রায় আট কোটি ৪৫ লাখ ২০ হাজার, রবি আজিয়াটার গ্রাহক ছিল প্রায় পাঁচ কোটি ৬৭ লাখ ৩ হাজার, বাংলালিংকের গ্রাহক ছিল প্রায় তিন কোটি ৯৭ লাখ ৭০ হাজার। তবে রাষ্ট্রীয় অপারেটর টেলিটকের মোবাইল গ্রাহক ছিল প্রায় ৬৫ লাখ ৫০ হাজারই রয়ে গেছে। যদিও মাঝে সেপ্টেম্বরে তা কমে ৬৫ লাখ ২০ হাজার হয়েছিল। সবচেয়ে বেশি গ্রাহক কমেছে বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তৈমুর রহমান সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও ফোন ধরেননি। হোয়াসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও প্রতি উত্তর পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে জানতে চাইলে রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম শেয়ার জানান, ‘বিগত কয়েক মাস ধরে মোবাইল সংযোগের সংখ্যা হ্রাসের প্রবণতা আমরা লক্ষ করছি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির হার এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ। তাছাড়া সিম করের বর্ধিত হার নতুন গ্রাহক অর্জনে ভর্তুকি প্রদানের ক্ষেত্রে অপারেটরদের ক্ষমতা হ্রাস করছে। ফলে মোট গ্রাহক সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে।’
এদিকে গত জুনে মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট গ্রাহক ছিল ১২ কোটি ৯১ লাখ ৭০ হাজার। জুলাইতে তা কমে দাঁড়ায় ১২ কোটি ৭৫ লাখ ২০ হাজার, আগস্টে ১২ কোটি ৬৯ লাখ ৭০ হাজার, সেপ্টেম্বরে ১২ কোটি ৪৮ লাখ ৮০ হাজার, অক্টোবরে ১২ কোটি ৩৪ লাখ ৪০ হাজার, নভেম্বরে ১১ কোটি ৯০ লাখ ৬০ হাজার ও ডিসেম্বর শেষে ১১ কোটি ৭০ লাখ ৭০ হাজার। অন্যদিকে জুনে দেশে আইএসপি ও পিএসটিএন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল এক কোটি ৩৫ লাখ ৩০ হাজার। জুলাই ও আগস্টে তা অপরিবর্তিত থাকলেও সেপ্টেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় এক কোটি ৩৭ লাখ ৪০ হাজার। অক্টোবর ও নভেম্বরে তা অপরিবর্তিত ছিল। তবে ডিসেম্বর তা বেড়ে দাঁড়ায় এক কোটি ৪০ লাখ ৪০ হাজারে।




