উপবৃত্তি কি আসলেই গরিব শিক্ষার্থীরা পায়?

শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। প্রতিটি শিশুরই স্বপ্ন থাকে বড় হয়ে কিছু একটা করার, নিজের জীবনকে সুন্দর করার। কিন্তু অনেক সময় অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে সেই স্বপ্ন ঝরে যায় অঙ্কুরেই। এই সমস্যা দূর করতে সরকার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তির ব্যবস্থা করে থাকে। উপবৃত্তি একটি আর্থিক সহায়তা, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। তবে প্রশ্ন উঠেছে- এই উপবৃত্তি কি সত্যিই গরিব শিক্ষার্থিদের হাতে পৌঁছায়?

উপবৃত্তির মূল উদ্দেশ্য হলো পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আনা। সরকার, শিক্ষা বোর্ড এবং নানা সংস্থা বছরে নানা ধরনের উপবৃত্তি দিয়ে থাকে। সাধারণত, পরিবারের আর্থিক অবস্থা, শিক্ষার্থীর ফলাফল ও উপস্থিতি বিবেচনায় এই সহায়তা প্রদান করা হয়। তবে বাস্তব চিত্রটি কি এত সরল?

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, প্রকৃত গরিব শিক্ষার্থীরা উপবৃত্তি থেকে বঞ্চিত হয়। বিভিন্ন কারণে যারা বাস্তবে এই সহায়তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তারা অনেক সময় আবেদন করতেও পারে না। কখনও হয়ত দরিদ্র পরিবারের অজ্ঞতা, কখনও বিদ্যালয়ের অসহযোগিতা বা হয়তো প্রশাসনিক জটিলতা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আবার কখনও-সখনও দেখা যায়, যাদের আর্থিক অবস্থা মোটামুটি ভালো, তারাই কিছু প্রভাব খাটিয়ে বা নিয়মের ফাঁক দিয়ে উপবৃত্তি পেয়ে যায়। ফলে প্রকৃত গরিব শিক্ষার্থীরা তাদের প্রাপ্য সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়।

অনেক সময় আবেদন করার নিয়মকানুন এত জটিল হয়ে দাঁড়ায় যে গরিব পরিবারগুলোর পক্ষে তা ঠিকমতো বোঝা ও অনুসরণ করা সম্ভব হয় না। ফর্ম পূরণ, নানারকম কাগজপত্র জমা দেয়া, সময়মতো বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকাÑ সবই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে গ্রাম বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য এইসব নিয়ম-কানুন মানা সহজ নয়। অনেকে জানেই না কখন, কোথায় আবেদন করতে হবে। ফলে তারা উপবৃত্তির সুবিধা থেকে পিছিয়ে পড়ে।

এছাড়া একটি বড় সমস্যা হলো স্বচ্ছতা ও তদারকির অভাব। অনেক সময় বিদ্যালয় পর্যায়ে অনিয়ম দেখা যায়। মেধা বা আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় না এনে চেনাজানা বা বিশেষ কারও সুপারিশের ভিত্তিতে নাম তালিকাভুক্ত করা হয়। এতে করে গরিব অথচ অচেনা শিক্ষার্থীরা উপবৃত্তির আওতার বাইরে থেকে যায়। কিছু কিছু জায়গায় আবার অভিযোগ ওঠে, উপবৃত্তির টাকাও সময়মতো হাতে আসে না বা আসে আংশিক। ফলে উপবৃত্তির মূল উদ্দেশ্য অনেকটাই ভোঁতা হয়ে যায়।

তবে পুরো চিত্র যে হতাশাজনক, তা বলা যাবে না। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন অনলাইনে আবেদন প্রক্রিয়া চালু করেছে, যাতে সরাসরি যাচাই-বাছাই করা সম্ভব হয়। কিছু এলাকায় স্থানীয় প্রশাসন বা শিক্ষকরা আন্তরিকতার সঙ্গে প্রকৃত গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বাছাই করে উপবৃত্তির ব্যবস্থা করছেন। এসব উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু সার্বিকভাবে দেখলে এখনও অনেক দূর এগোতে হবে, যেন প্রকৃত সুবিধাভোগীরাই উপবৃত্তির টাকায় পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারে।

উপবৃত্তি যথানিয়মে গরিব শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দিতে হলে কিছু পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, আবেদন প্রক্রিয়াটি সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে। বিশেষ করে গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য ফরম পূরণের কাজ সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা দরকার। দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয় পর্যায়ে একটি স্বচ্ছ কমিটি গঠন করে প্রকৃত দরিদ্রদের নির্বাচন করতে হবে। তৃতীয়ত, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উপবৃত্তির অর্থ সরাসরি শিক্ষার্থীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানো যেতে পারে, যেন মধ্যস্বত্বভোগীর পক্ষে নাক গলানোর বা কোনো অনিয়ম করার সুযোগ না থাকে। শিক্ষার্থীদের ও তাদের অভিভাবকদের সচেতন করাও জরুরি। উপবৃত্তির আবেদন সম্পর্কে যথাযথ তথ্য প্রচার করতে হবে, যাতে কোনো গরিব শিক্ষার্থী সুযোগের অভাবে বঞ্চিত না হয়। শিক্ষকরা এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন- তারাই সবচেয়ে ভালো জানেন কোন শিক্ষার্থী সত্যিকারের আর্থিক অসচ্ছলতায় ভুগছে।

উপবৃত্তি প্রকৃত গরিব শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে পারলে তা তাদের জীবনে বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে। একজন গরিব শিক্ষার্থীর হাতে উপবৃত্তির টাকা মানে শুধু কিছু টাকার সহায়তা নয়, বরং একটি নতুন স্বপ্নের পথচলা। তাই এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি যেন যথাযথভাবে পালন করা হয়, সে দিকে আমাদের সবারই দৃষ্টি দেয়া উচিত। কারণ আজকের শিক্ষার্থীই তো আগামী দিনের দেশ গড়ার কারিগর।

লেখক: নিশাত বিনতে আনসার, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়