একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ৩০ ডিসেম্বর। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত মনোনয়নপত্র দাখিল করা যাবে। ২ ডিসেম্বর বাছাইয়ের পর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা যাবে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ১০ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দের পর আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করতে পারবেন প্রার্থীরা। রাজনৈতিক দল, প্রতিদ্বন্দ্ব^ী প্রার্থী, ভোটার সবাই এখন নির্বাচনমুখী। দৃষ্টি নির্বাচনের দিকে। একই সঙ্গে নানা প্রশ্ন ভোটারদের মধ্যে। পাঁচ বছর পরপর ভোটাররা সুযোগ পান জাতীয় পর্যায়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের। গত নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় অর্ধেকেরও বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বি^তায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাছাড়া নির্বাচন ঘিরে সারা দেশে সহিংস ঘটনাবলির কারণে জনগণের মাঝে নির্বাচন তেমন আমেজ সৃষ্টি করতে পারেনি। তবে আসছে সংসদ নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ রয়েছে। জনগণের মধ্যে তাই একটা আমেজ সৃষ্টি হয়েছে।
এমন একটা পরিস্থিতিতে ‘পৃথিবীর কোথাও শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না’ এমন মন্তব্য করেছেন নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম। বাংলাদেশেও শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় মন্তব্য করে তিনি একটি ‘গ্রহণযোগ্য’ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে বলেছেন, এমন একটি নির্বাচন করা হবে, যা নিয়ে কারও প্রশ্ন থাকবে না। নির্বাচন এলেই বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলে টানাপড়েন শুরু হয়। ক্ষমতাসীনরা তাদের শাসন অব্যাহত রাখতে নানা কৌশলের আশ্রয় নেয়। এসব কৌশল সম্পর্কে বিরোধীদের সম্যক ধারণা থাকায় তারাও আপত্তি তোলেন এবং দাবি জানান একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের। এ ধারা চলে আসছে বলা যায় এদেশে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকেই।
এ পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনার যে কথা বলেছেন, সেটা হয়তো বাস্তব। কিন্তু এমন দায়িত্বপূর্ণ পদে থেকে দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এ ধরনের মন্তব্য কতটা যুক্তিসঙ্গত, সে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। কারণ দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছ থেকে এমন বক্তব্য এলে বিভিন্ন মহল থেকে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা কিন্তু অস্বাভাবিক নয়। এও সত্য, গণতান্ত্রিক বলে সুপরিচিত দেশেও নির্বাচন নিয়ে কিছু প্রশ্ন দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কয়েকবার। বিল ক্লিনটনের দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়া নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনে বিদেশি, বিশেষত রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে এখনও তদন্ত চলছে। অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশ ভারতে নির্বাচনকালে নানা সহিংস ঘটনার খবর আমরা পাই। দুটিই বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ বলে পরিচিত। হয়তো সেসব দেশের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকেই নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম বলেছেন, ‘শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন কোনো দেশেই হয় না, আমাদের দেশেও হবে না। এ অবস্থায় আমরা বলতে চাই, একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আমরা চাই, যেটা সব প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকে।’ সত্য কথাই নির্বাচন কমিশনার বলেছেন। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন হলেও সেখানে কমিশন নির্বাচনে প্রভাব খাটিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে কোনো পক্ষকে সুবিধা করে দেবে এমন ধারণা সেসব দেশে দেখা যায় না। ওইসব দেশে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তাই কমিশনকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে প্রতিটি নির্বাচনের আগে বিরোধী দলগুলো কমিশনের নিরপেক্ষতা, সক্ষমতা, আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এ অবস্থায় নির্বাচনের আগে একজন কমিশনারের মুখ থেকে ওই রকম মন্তব্য মানুষ আশা করে না। সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে জনগণকে আশ্বস্ত করাই বরং নির্বাচন কমিশনের প্রথম করণীয়। একই সঙ্গে আগামী জাতীয় নির্বাচনের একটি গ্রহণযোগ্য মান বাজায় থাকবে এবং দেশ গণতন্ত্রের পথে আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে, এটাই ভোটারদের প্রত্যাশা।
নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা অবশ্য বলেছেন যে, নির্বাচন কমিশনকে জবাবদিহি করতে হয় জনগণের কাছে। সুতরাং এমন কোনো নির্বাচন তারা করতে চান না, যে জন্য জনগণের প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। সাংবিধানিক এ দায়িত্ব পালনে তাই তাদের আরও বেশি দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।




