সমাজ গড়ার কারিগর সোমেন চন্দ পাঠাগার

শরীফ ইকবাল রাসেল, নরসিংদী : বিজ্ঞানভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়তে দুযুগ ধরে কাজ করে যাচ্ছে নরসিংদীর সোমেন চন্দ পাঠাগার। জেলার পলাশ উপজেলার সুলতানপুর গুদারাঘাট এলাকায় প্রতিষ্ঠিত এ পাঠাগারটি। ২৪ বছর ধরে বইপাঠ, পাঠক সমাবেশসহ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে বইপড়া কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে পাঠাগারটি। এছাড়া বই পড়ে বই পুরস্কার ও পড়–য়া সমাবেশের মাধ্যমেও একটি জাগরণ তৈরি করছে পাঠাগার কর্তৃপক্ষ।

দুই শতাধিক বই আর ২০-২৫ পাঠক নিয়ে ১৯৯২ সালের ১২ ডিসেম্বর ‘হাসনা হেনা পাঠাগার’ নামে যাত্রা এ পাঠাগারের। পরে ১৯৯৬ সালে এ পাঠাগারের নামকরণ করা হয় সাহিত্যিক সোমেন চন্দের নামে।

ভারতবর্ষের প্রগতিশীল এক লেখক সোমেন চন্দ। তিনি একসময় ছোট গল্পকারদের মধ্যে সেরা লেখকের স্বীকৃতি লাভ করেন। তার পৈতৃক বাড়ি পলাশ উপজেলার বালিয়া গ্রামে। শুধু তাই নয়, এ সোমেন চন্দ একজন প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতাও ছিলেন। মূলত তার নামানুসারেই এ পাঠাগারের নামকরণ।

পাঠাগারটির প্রধান উদ্যোক্তা ও সভাপতি শহিদুল হক সুমন জানিয়েছেন, ১৯২০ সালের ২৪ মে তৎকালীন ঢাকা জেলার টঙ্গি থানার আশুলিয়া গ্রামে তার মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন সোমেন চন্দ। তার পৈতৃক নিবাস ছিল পলাশ উপজেলার চরসিন্দুর ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামে। তার বাবা নরেন্দ্র কুমার ও মা হীরণ বালা।

১৯৩৭ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশ পায় সোমেন চন্দের প্রথম গল্প ‘শিশু তপন’। এই ১৭ বছরেই বাংলাদেশে বন্যার যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুর্ভোগ, তা নিয়ে বাংলা সাহিত্যে প্রথম উপন্যাস ‘বন্যা’ লেখেন সোমেন। তিনি প্রগতি লেখক সংঘে যোগদান করেন এবং মার্কসবাদী রাজনীতি ও সাহিত্য আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান। তিনিই বাংলা সাহিত্যে প্রথম গণসাহিত্যের ওপর কাজ শুরু করেন। তার আদর্শকে ধারণ করে একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতেই এই পাঠাগারের নামকরণ তার নামে করা হয় বলে জানায় কর্তৃপক্ষ।  

পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল হাসান জানান, পাঠাগারের শুরুটা নগণ্য হলেও আজ এর পরিধি বাড়ছে। এখন এ পাঠাগারে শুধু মানসম্মত বই রয়েছে তিন হাজারেরও ওপরে। নিয়মিত পাঠকই আছেন দুই শতাধিক, আর স্কুল-কলেজে রয়েছেন আরও পাঁচ শতাধিক পাঠক। এ পাঠাগারে মূলত সমাজচিন্তা, বিজ্ঞানচিন্তা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, দর্শন, অর্থনীতি, রাজনীতি ও শিশুসাহিত্য বিভাগের বই-ই বেশি। এছাড়া রয়েছে বাংলা-ইংরেজি একাধিক পত্রিকা ও ডজন খানেক স্বনামধন্য ম্যাগাজিন।

তিনি জানান, এ পাঠাগারের মাধ্যমে চরসিন্দুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর মাঝে বইপড়া কার্যক্রম করা হয়। এছাড়া চরসিন্দুর শহীদ স্মৃতি কলেজে আরও দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর মাঝেও এ কার্যক্রম রয়েছে। প্রতি শনিবার পাঠাগারের সদস্যরা বই নিয়ে স্কুল-কলেজের পাঠকদের হাতে বই তুলে দিচ্ছেন।

সাত দিনের মধ্যে এ বই পড়া শেষে আবার এগুলো ফেরত নিয়ে নতুন বই দেয়া হচ্ছে। এভাবে এক বছর অতিবাহিত হলে বছর শেষে মূল্যায়ন পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে পাঠক সমাবেশ করে পুরস্কার হিসেবে আবার নতুন বই তুলে দেয়া হয়।

পাঠাগারের নিয়মিত পাঠক মাহমুদুল হাসান জানায়, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে বই পড়া শুরু করে সে। পাঁচ বছরে তিনবারই মূল্যায়ন পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ণ হয়ে বই পুরস্কার পেয়েছে। এ বই পড়ার আগে সে অনেক কিছুতেই অজ্ঞ ছিল, কিন্তু এখন বই পড়ে বিজ্ঞান, দেশের প্রকৃত ইতিহাস, অর্থনীতি ও বড় বড় মনীষীর জীবনী সম্পর্কে জানতে পেরে কিছুটা আলোর মুখ দেখতে পেরেছে বলে মনে করে মাহমুদুল। 

সংগঠনের পাঠাগার-বিষয়ক সম্পাদক প্রবাল বর্মণ জানান, এ পাঠাগারটির বর্তমান অবস্থা এমন হয়েছে যে, প্রতি বছর কমপক্ষে ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকার নতুন বই কিনতে হচ্ছে। এ পাঠাগারের খবর শুনে স্থানীয় সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আশরাফ খান দিলীপ, নরসিংদীর সাবেক জেলা প্রশাসক কাজী আখতার হোসেন, পলাশের সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা আক্তার ও নরসিংদী চেম্বারের পরিচালক আল-আমীন রহমান কিছু আর্থিক সহায়তা করেন।

তিনি জানান, পাঠকদের বছরের শেষে মূল্যায়ন পরীক্ষার মাধ্যমে পুরস্কার হিসেবে ২০-২৫ হাজার টাকার বই উপহার দিতে হয়। এ অর্থ সংগ্রহ করতে হয় পাঠাগারের সদস্যদের চাঁদা আর কার্যকরী কমিটির সদস্যদের বিশেষ চাঁদার টাকায়।