মো. আরাফাত হোসেন: বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে যে বিষয়গুলো বা খাতগুলো তার মধ্যে অন্যতম একটি আইটি সেক্টর। পোশাক খাত ও সেবা খাতের সঙ্গে আগামী দিনে এই আইটি খাতকেই প্রতিযোগিতায় দেখা যাবে, এমনটাই প্রত্যাশা। আর এদেশেই রয়েছে আইটি খাতের অপার সম্ভাবনা ও সুযোগ, প্রয়োজন শুধু সামান্য উদ্যোগের।
সরকার আইটি খাতকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য এবং এর অগ্রযাত্রাকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে দিতে বিভিন্ন সময়োপযোগী উদ্যোগ নিচ্ছে, যা প্রশংসনীয়। অনেক আগে থেকেই আইটি খাত নিয়ে আশার স্বপ্ন দেখছে সরকার। আইটি খাতের উন্নয়নের জন্য ইতোমধ্যে সরকার ২০২৪ সাল পর্যন্ত আইটি খাতের সব ট্যাক্স মওকুফ করে দিয়েছে। যেমন কেউ সফটওয়্যার রপ্তানি করলে ১০ শতাংশ প্রণোদনা পাবে। দেশি সফটওয়্যার ব্যবহারে করপোরেট ট্যাক্স যাতে কমিয়ে দেওয়া হয় এবং বিদেশি সফটওয়্যার ব্যবহারে যাতে ট্যাক্স বাড়িয়ে দেওয়া হয়, সে বিষয়ে নীতি প্রণয়নে উচ্চপর্যায়ে চেষ্টা চলছে। এ ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো যে ক্রমবর্ধমান আইটি খাতকে এগিয়ে দেবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন আইটি খাত বিলিয়ন ডলারের ইন্ডাস্ট্রি। অফিশিয়াল রেকর্ড অনুযায়ী আইটি খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি ১০০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে ২০১৮ সালেই। আবার আইটি খাতের সম্পূর্ণ রপ্তানির পরিমাণ হিসাব করা যায় না, কেননা অনেক অনানুষ্ঠানিক রপ্তানি সরকারি হিসেবে আসে না। তাই বলা যেতে পারে এ খাতে উপার্জন তার থেকেও বেশি। আমরা আশা রাখতে পারি, খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমাদের প্রযুক্তি খাতের রপ্তানি গার্মেন্ট খাতকে অতিক্রম করবে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোয় আইটি-আইটিএস সেবা দেওয়া হচ্ছে। বলা হয়ে থাকে পোশাক খাতের পর আইটি খাতই দেশের অর্থনীতিতে আগামী দিনে নেতৃত্ব দিবে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান এভারেস্ট গ্রুপের একটি সাম্প্রতিক গবেষণামতে, বাংলাদেশে ৯০ কোটি থেকে ১১০ কোটি মার্কিন ডলার বা ৯ হাজার কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৫ সাল নাগাদ তা প্রায় ৪৮০ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে। সম্প্রতি বাংলাদেশে সফটওয়্যার রপ্তানি বাড়ছে। এখন বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম ফ্রিল্যান্সিং দেশ।
প্রযুক্তির কল্যাণে ব্যাংকিং সেবা বদলে গেছে। এখন টুইটার, ভাইভার ও হোয়াটসঅ্যাপেও ব্যাংকিং কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। অনলাইন ব্যাংকিং কার্যক্রমে পুরো ব্যাংকিং সেবা এখন হাতের মুঠোয় এসে গেছে। ব্যাংকিং সেক্টরকে দেশীয় সফটওয়্যার ব্যবহারের জন্য উৎসাহিত করা এবং দেশীয় সফটওয়্যারও যথাযথভাবে উপযোগী করে গড়ে তোলার চেষ্টা চলমান আছে।
গত ১১ বছরে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৫৬ লাখ থেকে ১০ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। সরকার আইটি খাতে আগামী পাঁচ বছরে নতুন করে ১০ লাখ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য কাজ চলছে বলে জানিয়েছে সরকার। বাংলাদেশের হাই-টেক পার্কগুলোয় বিনিয়োগসহ আইসিটি খাতে আগামী দিনগুলোয় যৌথভাবে কাজ করার জন্য সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনায় বসছে। হাজারো তরুণ-তরুণী প্রশিক্ষণ নিতে পারবে এসব সেন্টারে। বেকার তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান তৈরি হবে। বর্তমানে দেশে সাড়ে ছয় লাখ আইটি ফ্রিল্যান্সার অনলাইনে বিভিন্ন মার্কেট প্লেসে কাজ করছেন। তারা শত শত মিলয়ন ডলার আয়ও করছেন।
তথ্যপ্রযুক্তির এত সাফল্য ও সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এর সামনে রয়েছে শুরু থেকেই অনেক বড় বড় বাধা-বিপত্তি। আইটি খাতে সাফল্যের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যাÑকানেক্টিভিটি, সেই কানেক্টিভিটির পথে সমস্যা হিসেবে দেখা যায় ধীরগতিসম্পন্ন নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা। এ কারণে প্রত্যন্ত এলাকায় যথাযথ এমনকি একান্ত প্রয়োজনীয় নেটওয়ার্কটুকুর অনুপস্থিতি আইটি খাতের প্রধান উদ্দেশ্যকে সমস্যায় ফেলছে। হিসাবমতে, প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪০ হাজার বিভিন্ন পর্যায়ের স্নাতক এবং প্রকৌশল ও আইটি খাত থেকে ১০ হাজার স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থী বের হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, তারা আইটি বিষয়ে যতটুকু দক্ষতা অর্জন করার কথা তা পারে না। এ কারণে তাদের আবার ট্রেনিং নিতে হচ্ছে। এসবের জন্য দায়ী করা যায় ব্যবহারিক শিক্ষার অভাব এবং ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমির মধ্যে একটি যোগসূত্র তৈরি না হওয়ার কারণকে। তাই এসব দিকে দৃষ্টি দিতে হবে, যাতে এ খাতের প্রয়োজনের দিকে নজর রেখে কারিকুলাম তৈরি করা যায়। আবার চলমান উন্নয়নের প্রথম বাধা হিসেবে গতিরোধ করছে বছরের শুরুতে আবির্ভাব হওয়া করোনা। যেমন করোনা প্রতিরোধে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির প্রথম মাসেই বড় ধাক্কা খেয়েছে দেশের উদীয়মান তথ্যপ্রযুক্তি খাত। শুধু হার্ডওয়্যার বিক্রিই বন্ধ হয়েছে এক হাজার ২০০ কোটি টাকার। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশনের মতে, এ পরিস্থিতিতে মাসে এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় হাজার কোটি টাকা করে। এ অবস্থায় সংকট উত্তরণে সরকারের কাছে সাহায্য চাচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ।
বর্তমান আধুনিক সভ্যতার উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি নির্ভর করছে তথ্য ও প্রযুক্তির ওপর। আজকের বিশ্বের সম্পদ হিসেবে যেহেতু তথ্যকে বিবেচনা করা হয়, তাই তথ্যের আধুনিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির সংযোগ থাকবে সর্বোত্তমভাবে এবং এই তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি সম্পদ যথাযথভাবে কাজে দেবে। বর্তমানে আমরা এমন একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যা সম্পূর্ণভাবে আইসিটিনির্ভর। আর এই আইসিটি গঠিত হয়েছে হার্ডওয়্যার, সফ?টওয়্যার, নেটওয়ার্ক প্রভৃতির সমন্বয়ে। আর সবকিছুর সমন্বয় হচ্ছে শুধু তথ্যের ব্যবহারকে কেন্দ্র করে। আইটি খাতকে বর্তমান যুবসমাজ খুবই আগ্রহের সঙ্গে নিচ্ছে এবং যথাযথ সাফল্যও অর্জন করতে পারছে। সুতরাং বিদ্যমান সমস্যাগুলো দূর করার জন্য ও যথাযথভাবে সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তিপর্যায়ে সবার এগিয়ে আসার মধ্য দিয়েই আমরা হতে পারব আইটিসমৃদ্ধ এক জাতি। সেইসঙ্গে সমৃদ্ধ হবে আমাদের অর্থনীতি থেকে শুরু করে সব প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্র।
শিক্ষার্থী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়




