সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সতর্ক থাকা দরকার

মো. জিল্লুর রহমান: বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক। এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা বর্তমানে ২৫০ কোটির বেশি। দিন দিন এ সংখ্যা বেড়েই চলছে। কারও কারও কাছে ফেসবুক এতটাই আকর্ষণীয় যে, ফেসবুকে লগইন করে দিন শুরু করেন আবার ফেসবুকে লগআউটের মাধ্যমে ঘুমাতে যান। বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটির নানা দিক রয়েছে, সাধারণ ব্যবহারকারীরা তা হয়তো একদমই জানেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের আধুনিক জীবনে এক নতুন বাস্তবতা। গ্রামের চায়ের দোকানে মানুষ তথ্যের জন্য এখন আর পত্রিকার পাতা ঘাঁটাঘাঁটি করে না। তার বদলে এসেছে স্মার্টফোন ও আইফোন নির্ভরতা।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হচ্ছে কম্পিউটার, ল্যাপটব, স্মার্টফোন ও আইফোন। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে যে কোনো ব্যক্তি তথ্য, মতামত, ছবি, ভিডিও ইত্যাদি আদান-প্রদান করতে পারে। এগুলো হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রাণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনলাইন সামাজিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের থাকে অনেক উৎস ও অনেক প্রাপক। প্রথাগত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমের থাকে একটি উৎস ও অনেক প্রাপক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া থেকে আলাদা।

আমাদের টাইমলাইন, নিউজফিড ভরে যায় প্রয়োজনীয়, অপ্রয়োজনীয় সংবাদ, ছবি ও ঘটনায়। এ সুযোগটি করে দিচ্ছে ইন্টারনেট। সারাবিশ্বে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৭০ শতাংশ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংযুক্ত রয়েছে। তরুণদের মধ্যে এ হার আরও বেশি, প্রায় ৯০ শতাংশ। বাংলাদেশে যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ মানুষের রয়েছে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট।

বাংলাদেশেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩ কোটিরও বেশি। বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের বছরে আয় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। সারাবিশ্ব থেকে ফেসবুকের মোট রাজস্ব আয় বাংলাদেশি টাকায় দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি। আন্তর্জাতিক আয়ের ওপর নির্দিষ্ট হারে কর ও অন্যান্য ব্যয় বাদে এ প্রান্তিকে ফেসবুকের নিট মুনাফার পরিমাণ বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৫১ হাজার ৭৭৩ কোটি টাকা। এ হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে আয়ের পরিমাণ ফেসবুকের মোট আয়ের পরিমাণ শূন্য দশমিক দুই শতাংশ। ২০১৯ সালে মাত্র ৩ মাসেই ফেসবুক আয় করেছে ৩ হাজার ৬০ কোটি টাকা। বাংলাদেশে শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন ২০১৮ সালে আয় করেছিল প্রায় ১৩ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ সরকারকে কর দিয়ে ওই বছরে বিনিয়োগ ও অন্যান্য খরচ বাদে তাদের নিট মুনাফা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

ইদানীং আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর অতিনির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। অতি আপনজনকে মুহূর্তের মধ্যে তুচ্ছ ও শত্রুতে পরিণত করছি। আবেগতাড়িত হয়ে যাচ্ছি। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে আমরা বর্তমান সময়ে একটি ভালো বন্ধু বলে বিবেচনা করি। কারণ এখানে তাৎক্ষণিকভাবে সবার ভালোমন্দ মতামত, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, ছবি, ভিডিও ইত্যাদি দেখতে পারি এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া, পছন্দ, অপছন্দ ও অনুভূতিও ব্যক্ত করতে পারি। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু নেতিবাচক দিকও আছে। যেমন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সন্দেহ ও গুজব বাতাসের আগে ধাবিত হয়। তাছাড়া গুজব সন্দেহ ও মিথ্যা কল্পকাহিনি ছড়াতে প্রবল সহযোগিতা করে এবং গুজব কোনো কোনো সময় সমাজে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করে। হিংসা ও বিদ্বেষ ছড়াতে ফেসবুক খুবই সিদ্ধহস্ত। শিক্ষিত- অশিক্ষিত অধিকাংশ লোকজন এ সময় সত্য মিথ্যা যাচাই করে না। সন্দেহ ও গুজবকে কেন্দ্র করে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ডালপালার আকারে বিস্তৃতি ঘটায়। আবার অনেক সময় গুজবে কান দিয়ে সিংহভাগ মানুষ বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনে। ফলে এসব গুজব যানমালের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ আইন হাতে তুলে নেয় এবং আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটায়। হিংসা, বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা, উসকানি বিষবাষ্পের মতো চরম আকার ধারণ করে।

আবার ফেসবুকের মাধ্যমে অনেকে বয়স লুকিয়ে কম বয়সীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করে, এমনকি কেউ কেউ প্রডিউসার পরিচয় দিয়ে অভিনয় বা মডেলিংয়ের লোভ দেখিয়ে অশ্লীল ছবি ও বার্তা আদান-প্রদান করে থাকে। এই অন্যায় কর্মের সঙ্গে জড়িত রয়েছে ১৮ বছরের কম বয়সী প্রায় দুই কোটি কিশোর-কিশোরী। অথচ ১৮ বছরের নিচে কেউ অ্যাকাউন্ট খোলা নিষেধ। ফেসবুক আমাদের দৈনন্দিন সামাজিক জীবনে খারাপ প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এমনকি শিশুদের মনে ফেসবুক প্রায় নেশার মতো কাজ করছে। এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সামাজিক সম্পর্কটাই। ফেসবুকের মাধ্যমে বর্তমানে মেয়েরা ডিজিটাল ইভটিজিংয়ের শিকার হচ্ছে। ফেসবুকের মাধ্যমে মানুষ এখন সমাজের আসল বন্ধুদের চেয়ে সাইবার দুনিয়ার বন্ধুদের পেছনে বেশি সময় ব্যয় করছে। এতে তারা সমাজ থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে পারিবারিক সম্পর্কেও ফাটল ধরছে। ফেসবুকে অনেকের বেনামি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। বিশেষ করে অনেক নারীর নামে অ্যাকাউন্ট করা হয়েছে অথচ যার নাম তিনি হয়তো জানেনই না। এসব পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে ভয়ানক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। ফেসবুকের ম্যধমে বর্তমানে অনেক দেশে ভুয়া তথ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উস্কে দিচ্ছে।

গত বছর ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় ফেসবুকে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট হ্যাকিংককে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকজন নিহত ও শতাধিক লোক আহত হয়েছিল। একই ধরনের ঘটনা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর ও কক্সবাজারের রামুতেও ঘটেছিল। একইভাবে ছেলে ধরা সন্দেহ, পদ্মা সেতুতে মাথার খুলির প্রয়োজন, মানুষকে সন্দেহবশত পিটিয়ে হত্যার মতো জঘন্য ও অবিশ্বাস্য অপরাধ এ কারণে ঘটে। তাছাড়া মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যেসব অপরাধ যেমন হত্যা, ধর্ষণ, লুট, বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুরিয়ে দেয়া, শিশু ও নারীদের আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা, গবাদি পশু ও খাদ্যশস্য লুট ইত্যাদি লোমহর্ষক ঘটনা রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী ও তাদের ইন্ধনে সংগঠিত হয়েছে, তার পেছনে প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের বিষবাষ্প ছড়িয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক। বিদ্বেষ ও উস্কানি দেয়ার অভিযোগে মিয়ানমারের উচ্চপদস্থ বেশ কয়েকজন জেনারেল ও ধর্মীয় নেতার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ব্লক করে দিতে বাধ্য হয় এবং ফেসবুক এজন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিল, এ বিষয়ে তাদের আরও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন ছিল। এসব হিংসা, বিদ্বেষ ও উস্কানিমূলক পোস্টের কারণে ইদানীং বহু মানুষের ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ব্লক করার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে।

ব্রিটেনের আইনজীবীরা বলছেন, ইদানীং ফেসবুকের কারণেই সে দেশে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা বেড়ে চলছে। বিবাহিতরা অনলাইনে নতুন কারও সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ছেন কিংবা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এছাড়া সন্দেহপ্রবণ দম্পতিরা তাদের সঙ্গীকে পরীক্ষা করার জন্যও ফেসবুক ব্যবহার করছেন। ব্রিটেনের একজন আইনজীবী বলেছেন, গত নয় মাসে তিনি যতগুলো বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটিয়েছেন, তার সবগুলোই ফেসবুকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এ কারণে দেশটির অনেকে বিবাহিত দম্পতিদের ফেসবুক ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করছেন।

প্রতিটি ব্যবহারকারীকে নৈতিকতা এবং নিয়মনীতি মেনে ফেসবুক ব্যবহার করতে হবে।

সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো, অ্যাকাউন্ট খোলার সময় অবশ্যই তার আসল পরিচয় নিশ্চিত হয়ে অ্যাকাউন্ট অনুমোদন দেয়া। এ ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্ট খোলার সময় ফেসবুক কর্তৃপক্ষ আবেদনকারীর সরকারি কোনো পরিচয়পত্রের সঙ্গে আইপি অ্যাড্রেস বা অন্য কোনো উপায়ে নিশ্চিত হয়ে অ্যাকাউন্ট অনুমোদন দেয়া। 

মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক মিথ্যা তথ্যের মাঝে সত্য বিষয় বুঝা কঠিন হয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যেকোনো ঘটনা যাচাই-বাছাই করা প্রত্যেকটি সচেতন মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। সন্দেহ ও গুজবের বিষবাষ্প ছড়ানো চরম বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়। এ ধরনের সংকটময় সময় গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রধানরা যদি কার্যকর ও উদ্যোমী ভূমিকা পালন করে, তবে অনেকাংশে এ ধরনের ঘটনা এড়ানো সম্ভব। 

ব্যাংকার ও ফ্রিল্যান্স লেখক

zrbbbp@gmail.com