আধুনিক সভ্যতার একটি ভয়াবহ মাদক ইয়াবা। এটি এক ধরনের নেশাজাতীয় ট্যাবলেট, যা মেথাফেটামাইন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণ। তবে এর মূল উপাদান মেথঅ্যামফিটামিন। যুক্তরাজ্যের ড্রাগ ইনফরমেশনের তথ্যমতে, ইয়াবা ট্যাবলেট খেলে সাময়িকভাবে উদ্দীপনা বেড়ে যায়। কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হেরোইনের চেয়েও ভয়াবহ। তথাপি আমাদের দেশে জ্যামিতিক হারে ইয়াবার ব্যবহারকারী সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
যতদূর জানা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা নাৎসি সেনাদের ক্লান্তি দূর করে তাদের মধ্যে উদ্দীপনা ফিরিয়ে আনতে জার্মান প্রেসিডেন্ট অ্যাডলফ হিটলারের আদেশে ইয়াবা আবিষ্কৃত হয়। কিন্তু বর্তমানে ট্যাবলেটটি মাদক দ্রব্য হিসেবে ব্যবহƒত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়াবা সেবনে মস্তিষ্ক, নিদ্রাহীনতা, খিঁচুনি, মস্তিষ্ক বিকৃতি, রক্তচাপ বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক হƒৎস্পন্দন, হার্ট অ্যাটাক, ঘুমের ব্যাঘাত, শরীরে কিছু চলাফেরার অস্তিত্ব টের পাওয়া, অস্বস্তিকর মানসিক অবস্থা, কিডনি বিকল, চিরস্থায়ী যৌন অক্ষমতা, ফুসফুসের প্রদাহসহ ফুসফুসে টিউমার ও ক্যান্সার হতে পারে। এ ছাড়া ইয়াবায় অভ্যস্ততার পর হঠাৎ এর অভাবে সৃষ্টি হয় হতাশা ও আত্মহত্যার প্রবণতা। ধীরে ধীরে এটি অকেজো করে দেয় পুরো শরীর, মন ও মানসিকতার। এমনকি তারা মারামারি ও সন্ত্রাস করতেও পছন্দ করে।
বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে ইয়াবার উম্মাদনা সবচেয়ে বড় সমস্যা। অনুমান করা হয় যে, বাংলাদেশে প্রায় ৪৬ লাখ নিয়মিত ইয়াবার ব্যবহারকারী রয়েছে এবং সংখ্যাটি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। গত বৃহস্পতিবার বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের নয়াপাড়ার ঝিনাখালের কাছে নাফ নদী থেকে ৪ জনকে আটক করে এবং বুধবার রাতে উপজেলার হোয়াইকেং ইউনিয়নের খরংখালী এলাকা থেকে ২৫৬ হাজার ইয়াবা বড়ি জব্দ করে। অন্যদিকে একই দিন রাতে রাজধানীর দারুসসালামে অভিযান চালিয়ে ১১ হাজার ৬০০ পিস ইয়াবাসহ চার মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করেছে র্যাব। কী ভয়ানক চিত্র! বাংলাদেশ যেন ইয়াবা পাচারের আখড়া! এ অবস্থায় যত দ্রুত সম্ভব ইয়াবা পাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। তা না হলে দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ জনগোষ্ঠীর ধ্বংস অনিবার্য হয়ে উঠবে, যা মোটেই কাম্য নয়।
কোনো জিনিস সহজলভ্য হলে তার বিস্তার ঘটে দ্রুত। ইয়াবার ক্ষেত্রেও এমন হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। জানা গেছে, সড়ক ও নৌপথে অন্তত ২৯টি পয়েন্ট দিয়ে ভয়ানক এ মাদক সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। মূলত গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল এলাকায় মিয়ানমারের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং দেশটির নিয়ন্ত্রণাধীন একটি গ্রুপের অধীনে থাকা কারখানাগুলোয় ইয়াবা তৈরির পর রোহিঙ্গাদের কয়েকটি গ্রুপ ও দেশের মাদক সিন্ডিকেটের সদস্যদের মাধ্যমে তা মাদকসেবীদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ইয়াবার সহজলভ্যতা রোধে আইনরক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশ সরকারের ইতোমধ্যে মাদক নিয়ন্ত্রণে ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থানের কথা সর্বজনবিদিত। এটি কার্যকরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনে আরও শক্ত অবস্থান নিতে হবে এবং মাদক ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী বা ক্ষমতাবানদের বিন্দুমাত্র ছাড় না দেয়ার মানসিকতা নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। মাদক অপরাধের মামলার সংখ্যা অজগ্র হলেও উপযুক্ত সাক্ষী, তদন্ত কাজে কর্মকর্তার গাফিলতিসহ নানা কারণে এসব মামলা বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার বিকল্প নেই।
ইয়াবার সর্বনাশা ছোবল থেকে বেরিয়ে আসতে শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা, আদর্শ জীবনবোধ ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করা জরুরি। কেননা শুধু আইন করে মাদকের ব্যবহার ও বিস্তার রোধ করা সম্ভব নয়। মাদকমুক্ত জাতি গঠনে পরিবারকে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। শিশু-কিশোররা মাদক সেবনের দিকে যাচ্ছে কি নাÑএ ব্যাপারে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও তার সঠিক বাস্তবায়ন অপরিহার্য। একই সঙ্গে আইনের প্রয়োগে আরও কঠোর হওয়া উচিত, যাতে অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলিয়ে জামিন কিংবা মুক্ত হয়ে পুনরায় মাদক ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত হতে না পারে। ইয়াবাসহ সব ধরনের মাদকের বিস্তার রোধে রাষ্ট্র, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ দেশের সব স্তরের মানুষের সচেতনতা ও সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা গেলে এক্ষেত্রে সুফল পাওয়া যাবে এবং আদর্শ ও উন্নত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা যাবে।
চন্দন মন্ডল
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ
সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা