ইসমাইল আলী: গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত সাড়ে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) চালুর উদ্যোগ নেয়া হয় ২০১২ সালের ডিসেম্বরে, যদিও ৯ বছরে প্রকল্পটির অর্ধেকও শেষ হয়নি। তবে একাধিকবার এর নকশা ও স্পেসিফিকেশনে পরিবর্তন আনতে হয়েছে। ফলে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা।
তথ্যমতে, প্রকল্পটির পরিকল্পনায় দুই দফা সংশোধন আনা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমবার ফ্লাইওভারগুলো দুই লেনের পরিবর্তে চার লেন করা হয়। পরিবর্তন আনা হয় এগুলোর ডিজাইনেও। আর দ্বিতীয়বার বিআরটির এলিভেটেড অংশের ডিজাইন পরিবর্তন করতে হয়। আন্ডারপাস সংযোজন ও সড়কের কারিগরি ডিজাইনেও পরিবর্তন আনা হয়। এছাড়া গাজীপুর-বিমানবন্দর সড়ক জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করতে হয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৫৩৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা। তবে প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই হাজার ৩৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে দুই হাজার ৪৯৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা বা ১২২ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
সম্প্রতি প্রকল্পটির সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (আরডিপিপি) চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, বিআরটির সাড়ে চার কিলোমিটার অংশ এলিভেটেড (উড়ালপথে)। বাকি ১৬ কিলোমিটার অ্যাট গ্রেড (মাটিতে) সড়ক, ১০ লেনবিশিষ্ট টঙ্গী সেতু ও ছয়টি বিআরটি স্টেশন নির্মাণ এবং ৫০টি আর্টিকুলেটেড (দুই বগির জোড়া লাগানো) বাস কেনা রয়েছে প্রকল্পটির আওতায়। এর মধ্যে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এলিভেটেড অংশের ডিজাইন করে ২০১৫ সালে। আর ঠিকাদার নিয়োগ করা হয় ২০১৭ সালের ১৯ অক্টোবর। তবে নির্মাণ শুরু করা হয় ২০১৯ সালে। চার বছর পেরিয়ে যাওয়ায় বিআরটির এলিভেটেড অংশ নির্মাণে জটিলতা দেখা দেয়।
তথ্যমতে, বিআরটির সাড়ে চার কিলোমিটার এলিভেটেড অংশে আটটি র্যাম্প ও ১৬৩টি স্প্যান রয়েছে। এর মধ্যে ৭৮টি স্প্যান আই গ্রিডার ও ৮৫টি বক্স গ্রিডার। টঙ্গী থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কটি অত্যন্ত ব্যস্ত করিডোর। প্রায় ২১টি জেলার সঙ্গে এই করিডোর যুক্ত। ২০১৪ সালের সার্ভে ডেটার ভিত্তিতে প্রতিদিন এ রুটে উভয় দিকে ৩৬ হাজার থেকে ৪৪ হাজার যানবাহন
চলাচল করত। ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬০ হাজারে। এমন ব্যস্ত একটি সড়কে যান চলাচল অব্যাহত রেখে বক্স গ্রিডার স্থাপন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে বক্স গার্ডারের পরিবর্তে আই গার্ডারের মাধ্যমে এলিভেটেড অংশ নির্মাণ করতে হচ্ছে।
আরডিপিতে বলা হয়েছে, প্রকল্প এলাকায় হাজী ক্যাম্পের সম্মুখভাগ, বিমানবন্দর রেলস্টেশন, বিআরটি স্টেশন, এমআরটি (মেট্রোরেল)-১ স্টেশন ও বিমানবন্দর টার্মিনাল ১ ও ২-এর মধ্যে সংযোগ স্থাপনে একটি আন্ডারপাস নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর দৈর্ঘ্য হবে ৬২০ মিটার, ট্রাভেলেটর অংশ ২৫০ মিটার, প্রস্থ ছয় দশমিক ৪০ মিটার ও উচ্চতা চার দশমিক ৩০ মিটার। এটি নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২০ কেটি টাকা। প্রাথমিকভাবে সড়ক ও জনপথ (সওজ) এটি নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করলেও পরে তা বাতিল করে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
এদিকে বিআরটি প্রকল্পের টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত বিদ্যমান সড়কাংশটি অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে বিভিন্ন সময়ে জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত হয়। ফলে সড়কের বিটুমিনাস বাইন্ডার/ওয়্যারিং কোর্সসহ পেভমেন্ট ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া অতিরিক্ত ট্রাফিক চলাচলের দরুন সড়কটি ব্যাপকমাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই বিদ্যমান সড়কের নকশা সংশোধন করা হয়। আর ফ্লাইওভার অংশে ক্রংক্রিট পেভমেন্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া বিদ্যমান সড়কে যান চলাচল নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বড় ধরনের মেরামত করতে হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে গেছে।
জানতে চাইলে প্রকল্পটির সওজ অংশের পরিচালক এএসএম ইলিয়াস শাহ শেয়ার বিজকে বলেন, বিআরটি প্রকল্পে বেশকিছু বিষয়ে সংশোধন আনা হয়েছে। এসব সংশোধন মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদন করেছে, যার ভিত্তিতে প্রকল্পটি সংশোধন করতে হচ্ছে। এরই মধ্যে আরডিপিপি চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখানে যাচাই-বাছাইয়ের পর তা পাঠানো হবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে।
উল্লেখ্য, গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের আওতায় বিআরটি প্রকল্পটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে সওজ, সেতু কর্তৃপক্ষ ও এলজিইডি। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল ২০১৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। পরে তা কয়েক দফা বৃদ্ধি করা হয়। এতে আগামী জুনে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে এখনও প্রায় অর্ধেক কাজ বাকি রয়েছে প্রকল্পটির। এজন্য আরও এক বছর প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।




