চলতি অর্থবছর দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে ৭ শতাংশ এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে ৪৩ শতাংশ। গতকাল শেয়ার বিজের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকায় সরকার এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি কমিয়ে দিয়েছে। এজন্য বসিয়ে রাখা হয়েছে তিন হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। তবে চাহিদা মেটাতে তেলচালিত কেন্দ্রগুলোয় বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেক বাড়াতে হয়েছে। যদিও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে চলেছে। দেশেও বাড়ানো হয়েছে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের দাম। পাশাপাশি কয়লার মূল্যও বাড়ানো হয়েছে। এ কারণে বড় ধরনের ঘাটতিতে পড়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।
প্রশ্ন আছে বিতরণ ও বিপণন নিয়েও। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় ‘সিস্টেম লস’ বিশ্বের সব দেশেই আছে। উৎপাদন থেকে ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত যে সঞ্চালন পথ, সে পথ পাড়ি দিতে গিয়ে বিদ্যুতের একটা অংশ ক্ষয় হয়, একেই আমরা সিস্টেম লস বলি। যুক্তরাষ্ট্রে এ হার ৫ শতাংশেরও নিচে আর আমাদের দেশে তা ১০ শতাংশের বেশি। এর কারণ হলো আমরা বিদ্যুৎ চুরি রোধ করতে পারছি না। এই সিস্টেম লসের পুরো টাকাই যোগ হয় উৎপাদন খরচের সঙ্গে। সরকার বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দিয়েই চলেছে। এই ভর্তুকির অর্থ যায় কোথায়? কমবেশি সবাই জানেন। কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই বেসরকারি কোম্পানিগুলো নিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। বসে থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য পিডিবিকে গুনতে হয় হাজার হাজার কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ।
চাহিদার কথা বিবেচনায় না নিয়ে তড়িঘড়ি করে, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান না করে, অনেক রকমের সুবিধা দিয়ে বেসরকারি খাতে বেশকিছু তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এভাবে স্থাপিত প্রায় ৪৪ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে আছে। ফলে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, কেন উৎপাদন কম হচ্ছে, উৎপাদনব্যয় বেশি হচ্ছে। গত ৫ জুন গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। দেশের মোট বিদ্যুতের ৫৫ থেকে ৬ শতাংশ গ্যাস দিয়ে উৎপাদন করা হয়। উৎপাদনব্যয় বাড়লে বিদ্যুতের দামও বাড়বে। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মসে পিডিবিকে ভর্তুকি দেয়া হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারি থেকে এ ভর্তুকি দেয়া বন্ধ রেখেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এতে বেসরকারি বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল পরিশোধ করতে পারছে না পিডিবি। ভর্তুকি বন্ধ রাখায় দ্রুত বিদ্যুতের দাম না বাড়ালে ঘাটতির চাপে পিডিবিকে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিতে হবে। তখন শিল্পকারখানায় উৎপাদন বিঘিœত হতে পারে। যেভাবেই হোক নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনৈতিক কার্যক্রম বৃদ্ধির পাশাপাশি এর চালিকাশক্তি হিসেবে বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে পণ্য বা সেবার দাম বাড়াতে হবে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন ৭ শতাংশের বিপরীতে উৎপাদনব্যয় ৪৩ শতাংশ বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক নয়। উৎপাদনব্যয় বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধান খতিয়ে দেখা গেলে হয়তো তা কমিয়ে আনাও সম্ভব হবে।