জ্বালানি তেলের দাম পরিশোধে দুই বিকল্পে বিপিসি

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে বিভিন্ন ধরনের আমদানি পণ্যের ব্যয় পরিশোধে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার (রির্জাভ) ওপর চাপ বাড়ছে। এতে ডলারের বিনিময় মূল্য বেড়েইে চলছে। পক্ষান্তরে দেশে টাকার মান কমছে। ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চাহিদা মতো জ্বালানি ব্যয় পরিশোধে ডলার সংকটে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এতে বিপিসির নিয়মিত এলসি পরিশোধে বেগ পেতে হচ্ছে। এর থেকে উত্তরণের জন্য বিপিসি ৩০ দিনের এলসি পেমেন্ট পরিশোধের পরিবর্তে ৯০ দিন এবং আমদানি ব্যয় পরিশোধে আন্তর্জাতিক ঋণ দাতা সংস্থাগুলোর কাছে ঋণপ্রাপ্তিতে যোগাযোগ করছে।

বিপিসি সূত্রে জানা যায়, দেশের কৃষি উৎপাদন, শিল্প প্রক্রিয়া, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, গৃহস্থালি ও অন্যান্য কাজে জ্বালানি চাহিদা জোগান নিশ্চিত করে বিপিসি। সদ্যবিদায়ী ২০২১-২২ অর্থবছরে বিপিসি মোট ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে বিক্রি করে। এর মধ্যে শুধু ডিজেল বিক্রি করেছে প্রায় ৪৯ লাখ টন, যা দেশের ইতিহাসে একক বছর হিসেবে সর্বোচ্চ বিক্রয়। অপরদিকে গত ২০২০-২১ অর্থবছরের দেশের মোট জ্বালানি তেল বিক্রয়ের পরিমাণ ছিল ৬৩ লাখ টন। এর মধ্যে ডিজেল বিক্রয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৬ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় সদ্যবিদায়ী অর্থবছরের জ্বালানি তেলের ব্যবহার বেড়েছে পাঁচ লাখ টন। আর ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল ৫৫ লাখ টন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ৬৫ লাখ ৪৯ হাজার মেট্রিক টন। 

বিপিসির বিক্রয় বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, চলতি বছরের শুরু থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেতে থাকে। বছরের শুরুতে ব্যারেলপ্রতি ৮০ থেকে ৯০ ডলার ছিল পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। আর রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ দরে ওঠে। এতে ব্যারেলপ্রতি পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে আমদানিকৃত ডিজেলের লিটারমূল্য ১৩৭ টাকা। কিন্তু দেশের স্বার্থে আমাদের ৮০ টাকা করে বিক্রি করতে হচ্ছে। অর্থাৎ লিটার শুধু ডিজেলে ৫৭ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। এছাড়া ফার্নেস অয়েল, কেরোসিনসহ অন্যান্য জ্বালানি তেলেও লোকসান দিতে হচ্ছে। এতে দিনে ১০০ কোটিরও বেশি লোকসান হচ্ছে।

জানা যায়, বিপিসি গত অর্থবছরে প্রায় ৪০ লাখ টন শুধু ডিজেল আমদানি করেছে। এছাড়া পরিশোধিত ফার্নেস অয়েল, পেট্রোলসহ আরও কিছু তেল আমদানি করেছে। এর বাইরে উš§ুক্ত দরপত্রের মাধ্যমেও জ্বালানি তেল কেনে বিপিসি।

অপরদিকে আরও প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে, যা সৌদি আরবের সৌদি অ্যারাবিয়ান অয়েল কোম্পানি (সৌদি আরামকো) ও আরব আমিরাতের আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (অ্যাডনক) থেকে কেনা হয়।

বিপিসির অর্থবিভাগ সূত্রে জানা যায়, দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে জ্বালানি তেল আমদানিতে প্রতি মাসে ১৬ থেকে ১৭টি আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খুলতে হয়। এতে এখন মাসে ৭৩ থেকে ৭৫ কোটি ডলারের ঋণপত্র খোলা দরকার হয়। এসব ঋণপত্রগুলো সোনালী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও ইস্টার্ণ ব্যাংকে খোলা হয়ে থাকে।

কর্মকর্তারা বলছেন, অভ্যন্তরীণ বাজারে ডলারের ঘাটতি রয়েছে জানিয়ে ব্যাংকগুলো চাহিদা অনুযায়ী ঋণপত্র খুলতে প্রায়ই অপারগতা প্রকাশ কর। এতে আমাদের কোনো কোনো সরবরাহকারীকে পাওনা পরিশোধে দেরি হয়। এ নিয়ে তারা চিঠি দিয়ে সতর্কও করেছে। এখনও আমাদের জুলাই মাসের অনেক এলসির পেমেন্ট অপরিশোধিত রয়েছে। এটা নিয়ে সবাই চিন্তিত। এর জন্য একাধিকবার মন্ত্রণালয়সহ বাংলাদেশে ব্যাংককে চিঠির মাধ্যমে অবহিত করা হয়। তবে আগস্ট মাসের প্রয়োজনীয় এলসি ওপেন করা হয়েছে। তবে ডলার সংকট না কাটলে তেল সরবরাহ কমতে পারে।

এ বিষয়ে বিপিসির চেয়ারম্যান এ বি এম আজাদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি সম্প্রসারণশীল হওয়ায় জ্বালানি তেলের চাহিদা ও সরবরাহ বাড়ছে। তবে বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় জ্বালানি তেল আমদানির মূল্য পরিশোধে ডলার সংকটের কারণে বেগ পেতে হচ্ছে। আমরা মূল্য পরিশোধে ৩০ দিনের পরিবর্তে ৯০ দিন করার জন্য আলোচনা করছি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা থেকে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ঋণ প্রাপ্তি নিয়ে আলোচনা করছি। এতে সফল হলে ডলারে ওপর চাপ কমে আসবে।