সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত আসক্তি অযোগ্য প্রজন্ম তৈরি করছে

মাকসুদা আক্তার: বর্তমানে ব্যাপক সাড়া ফেলা ‘বিশ্বগ্রাম’ ধারণায় তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ফেলছে বিশ্বব্যাপী। তথ্য  যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে খুব সহজেই যোগাযোগ করা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আধুনিক পৃথিবীটাকে করেছে সহজলভ্য। এটা অস্বীকার করার যেমন উপায় নেই, তেমনি এর অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে নেতিবাচক প্রভাবকে অস্বীকার করা যায় না। এর ভালো দিক থাকলেও নেতিবাচক দিকটাই যেন সমাজের মানুষকে পরিণত করছে মূর্খ মানুষে।

বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মধ্যে ফেসবুক, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, গুগলপ্লাস, স্কাইপ, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম অন্যতম। এগুলো ছাড়া বর্তমানে মানুষ অনেকটাই অচল। এসবের প্রতি নির্ভরতা দিনে দিনে যেন বেড়েই চলেছে। শুধু প্রাপ্তবয়স্ক নয়, শিশু, তরুণ, যুবক, বৃদ্ধ সবাই এসব সামাজিক মাধ্যমে এক প্রকার আসক্ত বলা যায়। এমন অনেক মানুষ আছে ফেসবুক ছাড়া যারা নিজেদের জীবন অচল মনে করে। ফেসবুকসহ সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর বিভিন্ন আকর্ষণীয় ফিচার মানুষকে খুব সহজেই আকৃষ্ট করে থাকে। ফলে সময়ের তোয়াক্কা না করেই মানুষ এসব মাধ্যমে সময় ব্যয় করছে এবং দিন দিন এর পরিমাণ ক্রমাগত বিস্ময়কর মাত্রায় বেড়েই চলেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশিক্ষণ থাকার কারণে সময়ের অপব্যবহার হচ্ছে, তেমনই এর ফলে নানা প্রকার সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে মানব জীবনে। আগে মানুষ শখের বসে বই বা বাগান করলেও এখন তাদের শখের জায়গা দখল করেছে একটি স্মার্টফোনের বিভিন্ন যোগাযোগ অ্যাপগুলো। এ অ্যাপগুলো এমন আকর্ষণীয় থিমে তৈরি করা, যার মাধ্যমে এতে ২ মিনিটের জন্য ঢুকলেও ২ ঘণ্টার আগে আপনার বেরোতে ইচ্ছে করবে না। কেউ হয়তো একটা ওয়ার্ড মিনিং দেখার জন্য ফোনটা হাতে নিয়েছে, দেখা যাবে ওয়ার্ড মিনিং ছাড়া তার সবই দেখা হবে। কিন্তু পুরোটাই সময় নষ্ট। এর ফলে মানুষের মূল্যবান সময়ের অপচয় হচ্ছে। আবার মানুষের শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা যেমনÑচোখের দৃষ্টি ক্ষয়, মাথাব্যথা, হাতব্যথা, শরীর ব্যথা, কানে কম শোনা প্রভৃতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তির কারণেই হচ্ছে।

সন্তানের জীবন সুন্দর করে গড়ে তোলার প্রধান প্রতিবন্ধকতা এখন এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার। অভিভাবকরা সন্তানের সামনেই ফেসবুকসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে বুঁদ হয়ে থাকেন। সন্তানকে গুণগত সময় না দিয়ে একটা ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে পিতা-মাতার প্রতি এক ধরনের আক্রোশ নিয়ে। সন্তানের হাতেও কিছু অসচেতন পিতা-মাতা স্মার্টফোন ধরিয়ে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্তান কী করছে, কাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে তার খবর নেয়ার সময়ও মা-বাবার হয় না। এটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক ভয়াবহ নিদর্শন। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের মধ্যে পর্ণো আসক্তদের ৮০ শতাংশই শিশু। এটা পরবর্তী প্রজন্মের বিপর্যস্ত ভবিষ্যৎ চিত্রই প্রকাশ করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে কভিডকালীন অবরুদ্ধ সময়ে। শিশু কিংবা বয়স্ক কেউই বাড়ির বাইরে যেতে পারেনি। ফলে তাদের কাছে বিভিন্ন ডিভাইস ছিল বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম। শিশুসন্তানদের বিকালে খেলাধুলার সময়টা এবং বয়স্ক লোকদের বিকালে হাঁটার সময়টা দখল করেছে এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কয়েকদিন আগে ব্রিটিশ কথাসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক হাওয়ার্ড এরিক জ্যাকবসন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, আগামী ২০ বছরের মধ্যে আমরা এমন শিশুদের পাব, যারা পড়তে পারে না।”

তরুণ প্রজন্মের যোগাযোগ পদ্ধতি খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ফলে বই পড়ার অভ্যাস হারাচ্ছে তারা; যা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক ধরনের ভয়াবহ বিপর্যয় বলা যায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে যেকোনো তথ্য খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। ফলে কিছু অসাধু ব্যক্তি মিথ্যা তথ্য দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে। এতে সামাজিকভাবে ব্যক্তিমানসে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। তরুণদের অধিকাংশই এসব মাধ্যমে তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে তাদের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে একাকিত্ব, বিষন্নতা। অনেক তরুণ-তরুণীর জীবন ধ্বংস হচ্ছে এসব কারণেই। অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মহত্যা করছে, যার পরিমাণ বেড়েই চলেছে।

আবার এসব মাধ্যমে শিশুরা সময় ব্যয় করায় অধিক মনোযোগী হওয়ায় তাদের শারীরিক বৃদ্ধি ঘটলেও অনেক সময় মানসিক বৃদ্ধি ঘটে না। তারা জানে না শিক্ষকদের সঙ্গে সঠিক আচরণের নিয়ম কিংবা বাড়িতে একজন অতিথি এলে তাকে স্বাগত জানানোর নিয়ম। ঘরকুনো স্বভাব তৈরি হচ্ছে শিশুদের মধ্যে। শিশুরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে না। তাদের স্মৃতিতে ক্রমাগত জায়গা করে নিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন বিকৃত ঘটনা। এর ফলে জাতি হচ্ছে মেধাশূন্য। শিগগির এ বিষয়ে সতর্ক পদক্ষেপ না নিলে তা জাতির জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।

শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

aktermaksuda05@gmail.com