মেঘনায় জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ, কমছে না দাম

আকাশ মো. জসিম, নোয়াখালী: সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় ইলিশ ধরতে নদীতে নামছেন জেলেরা। নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় মেঘনা নদীতেও নামছেন স্থানীয় জেলেরা। তবে ঝাঁকে ঝাঁকে ধরাও পড়ছে ইলিশ, কিন্তু দাম এখনও চড়া। ফলে ইলিশ এখনও সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে। 

জেলেরা জানান, নদীতে মাছ পাওয়া গেলেও প্রায় সব নৌকাই মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে নদীতে যায়। ফলে যেসব মাছ পাওয়া যায়, তা মহাজনদের কাছে কম দামে বিক্রি করতে হয়, স্থানীয় বাজারে বা বাইরে বিক্রি করা যায় না। ফলে স্থানীয় বাজারে দাম কমছে না।

সরেজমিনে হাতিয়া চেয়ারম্যান ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, গত ২৬ জুলাই ৯৯ মণ ইলিশ মাছ নিয়ে নোয়াখালীর হাতিয়া চেয়ারম্যান ঘাটে ভিড়েছিল ইলিশবোঝাই ট্রলার। সে মাছ ২২ লাখ টাকায় কিনে নেন মৎস্য ব্যবসায়ী ও আড়তদার বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আবু বকর ছিদ্দিক মিজান। এর আগে ২৫ জুলাই ৮৬ মণ ইলিশ নিয়ে চেয়ারম্যান ঘাটে আসে আরেকটি ট্রলার। দাম ভালো পাওয়ায় উপকূলবর্তী বিভিন্ন এলাকার জেলেরা এ ঘাটে ট্রলার ভেড়ায়। এ নিয়ে গত কয়েক দিন প্রচুর ইলিশ নিয়ে চেয়ারম্যান ঘাটে ভিড়ছে অসংখ্য ট্রলার। তবে এত ইলিশ আসার খবরেও বাজারে খুব একটা প্রভাব পড়ছে না।

স্থানীয় বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, ৫০০ গ্রামের প্রতিটি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকা দরে। ৮০০ গ্রাম থেকে এক কেজির ওপর ইলিশের দাম এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে, যা খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। দাম বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে সরেজমিনে চেয়ারম্যান ঘাটে গিয়ে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে কথা হয়।

কেন ইলিশের ভরা মৌসুমে ইলিশের দাম কমছে না, তা জানতে কথা হয় মৎস্য ব্যবসায়ী ও আড়তদার আবু বকর ছিদ্দিকের সঙ্গে। তিনি জানান, ইলিশ ধরার জন্য গভীর সমুদ্রে একটি ট্রলার পাঠাতে প্রয়োজনীয় লোকবলসহ তাদের কমপক্ষে ১০ দিনের খাদ্য ও জ্বালানি বাবদ আট থেকে ১০ লাখ টাকা খরচ পড়ে। এসব খরচের বাইরে আছে সরকারের নানা ধরনের ভ্যাট ও চাঁদা। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া হলে পুরো ট্রলার খালি অবস্থায় ফেরাতে হয়। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন জেলে ও ব্যবসায়ীরা। ছিদ্দিক বলেন, দেখা গেল পাঁচটি ট্রলারে এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করে পাঠালাম, এর মধ্যে দুটি ট্রলার মাছ নিয়ে আর বাকিগুলো খালি অবস্থায় ফিরছে। তখন লোকসান টানার আর সামর্থ্য থাকে না।

তিনি আরও বলেন, অনেক সময় জ্বালানি ফুরিয়ে যায়, অথবা কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে। কিন্তু এ সমস্যার বাইরেও আরেকটি বড় সমস্যা ভারতীয় জেলেদের উৎপাত।

তিনি বলেন, আপনি হাতিয়া চেয়ারম্যান ঘাট থেকে ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে গেলেই দেখতে পাবেন নদীর মোহনায় ভারতীয় জেলেরা অবাধে মাছ চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা চাইলেও তাদের তাড়িয়ে দিতে পারি না। গতিশীল ট্রলার প্রযুক্তি এবং অর্থের বিনিময়ে ভারতীয় জেলেদের মাছ শিকারের কারণে আমরা খালি হাতে ফিরছি। মাঝে মাঝে কোস্টগার্ডের উপস্থিতি টের পেলে জেলেরা সটকে পড়ে। কিন্তু তারা চলে গেলে আবার ফিরে আসে।

তাই কোস্টগার্ডের পাশাপাশি নৌবাহিনীর নিয়মিত টহল নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনিসহ ভুক্তভোগীরা। অবিলম্বে ভারতীয় জেলেদের উৎপাত বন্ধে প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।

তিনি আরও বলেন, ইলিশের দাম কমাতে হলে এসব সমস্যার পাশাপাশি সরকারের এ ক্ষেত্রে ভর্তুকি দিতে হবে। মৎস্য ব্যবসায়ীদের সহজ-সরল সুদে ঋণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

ঘাটের জনৈক ব্যবসায়ী হাবিব জানান, ঘনঘন বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে কারণে কাক্সিক্ষত বরফ মিলছে না। এতে প্রচুর ইলিশ পচে যায়, যার কারণে জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। তিনি সরকারের কাছে দাবি করেন, এখানে চেয়ারম্যান ঘাটে যেন একটি মৎস্য হিমায়িত করার জন্য কারখানা করে দেয়া হয়। তিনি দাবি করেন, ইলিশ ছাড়াও অন্যান্য মাছ সংরক্ষণে এবং বাজারজাত করতে ভূমিকা রাখবে এ হিমাগারটি।

এ বিষয়ে নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক দেওয়ান মাহবুবুর রহমান বলেন, আমরা কোস্টগার্ডকে অনেক বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য বলে দিয়েছি।