ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণে নতুন নিবন্ধন বন্ধ করতে হবে

মো. মিঠুন: আমাদের নগর পরিকল্পনাবিদরা প্রতিটি শহরকেই বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য নানা কর্মপরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়ন করে থাকেন, কিন্তু কেন জানি না সব উদ্যোগ সাধারণ মানুষের ব্যবহার-উপযোগী হয়ে ওঠে না। পরিবেশ দূষণও কমছে না এবং যানজটেরও নিরসন হচ্ছে না। পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউ এয়ার ভিজ্যুয়ার তথ্যমতে, বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাংলাদেশের ঢাকা। বায়ুমান মাপার আন্তর্জাতিক এই প্রতিষ্ঠান প্রতিদিনই বিশ্বের বড় শহরগুলোর বায়ুমান পরীক্ষা করে ফলাফল দিয়ে থাকে। এতে প্রায়ই দেখা যায়, বাংলাদেশের ঢাকা মহানগরী বিশ্বের দূষিত বায়ুর শহরের তালিকার শীর্ষে থাকে। বায়ুদূষণের মতো শব্দদূষণেও ঢাকার অবস্থান বিশ্বের বড় শহরগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথমে। বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণের সঙ্গে যোগ হয়েছে অতিমাত্রারয় যানজট। ২১ বছর ধরে নানা আয়োজনের মাধ্যমে ‘বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস’ পালিত হয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় এবারও বর্ণিল আয়োজনে আসছে ২২ সেপ্টেম্বর ‘বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস, ২০২২’ উদ্যাপনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে বিশ্বের অনেক দেশ। বাংলাাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। আসন্ন ‘বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস, ২০২২’ উপলক্ষে সাইকেল র‌্যালি, হাঁটা র‌্যালি, আলোচনা সভা, সেমিনারসহ নানা কর্মপরিকল্পনা শুরু হয়েছে। মূলত এই দিবস পালনের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষকে ব্যক্তিগত গাড়ি পরিহার করে, অর্থাৎ যান্ত্রিক যান ব্যবহার না করে অযান্ত্রিক যান, যেমন রিকশা, ভ্যান, সাইকেল, স্বল্প দূরত্বে পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতে সচেতন করা হয়। এর ফলে শুধু যানজট নিরসন নয়, জ্বালানি তেলের সাশ্রয়, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ ও বাতাসে কার্বনের মাত্রাও কমিয়ে আনার চেষ্টা চলে। অন্যদিকে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যও ভালো থাকে। এ দিবসটি পালনের আরও একটি মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে, শহরকে দূষণমুক্ত রাখা এবং বাসযোগ্য করে গড়ে তোলা।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকা সিটি এরিয়ার যানজটের কারণেই প্রতি বছর প্রত্যক্ষ ক্ষতি হয় মোট দেশীয় উৎপাদনের (জিডিপি) আড়াই শতাংশ। ‘দ্য ফিউচার প্ল্যানিং আরবান ট্রান্সপোর্টেশন ইন মপা’ গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী শুধু ঢাকাতেই যানজটের কারণে ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, যা টাকায় কনভার্ট করলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এক হাজার ৩৫৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের আমাদের এ প্রাণের ঢাকা শহরের সড়কের আয়তন মাত্র দুই হাজার ২০০ কিলোমিটার। এর বেশিরভাগই আবার প্রধান সড়ক। নগরকে যদি বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হয়, সে ক্ষেত্রে অবশ্যই সেই নগরে বা শহরে ২০ থেকে ২৫ ভাগ প্রশস্থ সড়ক থাকা প্রয়োজন। আমাদের দেশের ১০০ ভাগ মানুষের মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়িতে চলাচল করে মাত্র পাঁচ ভাগ মানুষ, আর ৯৫ ভাগ মানুষেরই ব্যক্তিগত গাড়ি নেই। এই ৯৫ ভাগ মানুষ সাধারণত গণপরিবহণেই চলাচল করে থাকেন। মনে করুন এক লিটার জ্বালানি তেল পুড়িয়ে একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে মাত্র তিন-চার যাত্রী পরিবহন করা হয়ে থাকে। অন্যদিকে খেয়াল করলে দেখতে পাই, একই  জ্বালানি খরচে একটি গণপরিবহন ৪০-৪৫ যাত্রী বহন করে সেবা দিয়ে থাকে। আমরা যদি স্বল্প দূরত্বে/হাঁটাপথে বাইসাইকেল অথবা রিকশায় চলাচল করি এবং দূরবর্তী যাত্রার ক্ষেত্রে গণপরিবহন ব্যবহার করি, তাহলে পরিবেশ, সময়, অর্থ ও জ্বালানি অপচয় রোধ করতে সক্ষম হব। অন্যথায় আমাদের সীমাহীন যানজট বাড়তেই থাকবে।

ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের গবেষণামতে, ২০২৫ সালে এই শহরে যানবাহনের গতি হবে ঘণ্টায় চার কিলোমিটার, যা মানুষের হাঁটার গতির চেয়ে কম। এছাড়া যানজটের কারণে  মানুষের মধ্যে ৯ ধরনের মানসিক আচরণগত সমস্যা তৈরি হয়। শুধু যানজট, সময়, জ্বালানি অপচয়, পরিবেশ দূষণ ও শব্দদূষণ নয়, এর বাইরেও অধিক মাত্রায় ব্যক্তিগত গাড়ি বৃদ্ধি এবং এর অনিয়ন্ত্রিত গতির ফলে সড়কে প্রতিনিয়ত ঘটছে অনাকক্সিক্ষত সড়ক দুর্ঘটনা, যার মাশুল গুনতে হয় সাধারণ মানুষকে অনাকাক্সিক্ষত পঙ্গুত্ববরণের মধ্য দিয়ে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২১ সালে সড়ক ও মহাসড়কে পাঁচ হাজার ৬২৯টি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়, যার ফলে সাত হাজার ৮০৯ জন নিহত এবং ৯ হাজার ৩৯ জন আহত হন। একটা বিষয় খেয়াল করুন, যে সাত হাজার ৮০৯ জন নিহত হয়েছেন, এর মধ্যে যিনি পরিবারের আয়ের একমাত্র ব্যক্তিই ছিলেন, তিনিই হয়তো এই অনাকাক্সিক্ষত সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছেন, যার ফলে সেই পরিবারটি আর্থিকভাবে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, পাশাপাশি খাদ্য, বাসস্থান, সন্তানের পড়াশোনা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎসহ নানা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল। আবার যিনি বা যারা আহত হলেন, তারাও আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবারের বোঝা হয়ে গেলেন। এর পরও সড়কে প্রতিদিন পাঁচশ’র অধিক ব্যক্তিগত গাড়িকে নতুন করে নিবন্ধন দেয়া হচ্ছে, যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজšে§র জন্য খারাপ বার্তা বহন করছে।

যানজট, ধূলিদূষণ, শব্দদূষণ দূর করে আমাদের এ প্রাণের শহর ঢাকাকে বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তুলতে প্রয়োজন স্থানীয় সরকার ও নগর উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত সংগঠনগুলোর সমন্বয়ের মাধ্যমে নগর উন্নয়ন কার্য সম্পাদন করে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা। গণপরিবহন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণে নতুন করে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ি ক্রয়ে ভর্তুকি না দিয়ে পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও শব্দদূষণ রোধে বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে। নগরে ব্যক্তিগত গাড়ির পার্কিং সুবিধা দিতে গিয়ে আমাদের বিনোদন ও সামাজিকীকরণের স্থানগুলোকে আমরা নষ্ট করে ফেলছি, কিন্তু এই জায়গাগুলোয় যদি আমরা পপ আপ বা মোবাইল প্লেগ্রাউন্ড ও পার্কলেট তৈরি করতে পারি, তবে অনেকাংশেই এই বিনোদনের জায়গাস্বল্পতা কিছুটা হলেও কমিয়ে আনা সম্ভব। নগর পরিকল্পনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের চাহিদা ও মতামতের গুরুত্ব অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর বিশেষ কর আরোপ করেও এর আধিক্য নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্বিবিদ্যালয়গুলোয় শীক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় নিজস্ব বাস সার্ভিস চালু করা হলে সবাই এর সুফল ভোগ করবে। সর্বোপরি হাঁটা, সাইক্লিং ও গণপরিবহন ব্যাবহারে সবাইকে উৎসাহিত করতে হবে। তবেই আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি বসবাস-উপযোগী যানজটমুক্ত, বায়ু ও শব্দদূষণহীন একটি পৃথিবী রেখে যেতে পারব।

উন্নয়ন কর্মী

mithun.00714@gmail.com