ইসমাইল আলী: ঢাকা-টঙ্গী রেলপথ ৩য় ও ৪র্থ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পটি নেয়া হয় ২০১২ সালের নভেম্বরে। তবে ১০ বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৬৫ শতাংশ। ভুল পরিকল্পনায় দফায় দফায় পিছিয়ে প্রকল্পটির কাজ, সংশোধন করতে হয়েছে নকশা। দুই দফা বাতিলও করা হয়েছে দরপত্র। আর এসব ভুল সংশোধন করতে গিয়ে প্রকল্পটির ব্যয় দ্বিতীয় দফা বাড়তে যাচ্ছে।
সম্প্রতি প্রকল্পটির ২য় সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (আরডিপিপি) চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে প্রায় ২৮৫ শতাংশ। এদিকে প্রকল্পটির মেয়াদ কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে। বর্ধিত মেয়াদ অনুযায়ী আগামী জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। তবে এখনও ৩৫ শতাংশ কাজ বাকি থাকায় প্রকল্পের মেয়াদ আরও চার বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
তথ্যমতে, ঢাকা-টঙ্গী রেলপথ ৩য় ও ৪র্থ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর ডাবল লাইন নির্মাণে প্রথমে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮৪৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ভারতের ঋণ দেয়ার কথা ছিল ৬৯৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। আর সরকারি তহবিল থেকে অবশিষ্ট ১৫২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। তবে প্রকল্পটির ডিটেইল ডিজাইন ও টেন্ডারিং সার্ভিস পর্যায়ে পরামর্শক সেবা অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এজন্য প্রথম দফা প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়।
ডিটেইল ডিজাইন ও টেন্ডারিং সার্ভিস পর্যায়ে পরামর্শক সেবা অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি ৯০ পাউন্ড রেলের পরিবর্তে ৫২ কেজির রেলের সংস্থান রাখা হয়। এতে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায়
এক হাজার ১০৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ২০১৪ সালের অক্টোবরে তা অনুমোদন করে একনেক (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি)। এর মধ্যে ভারতের ঋণ ধরা হয় ৯০২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। আর সরকারি তহবিল থেকে দেয়ার কথা ছিল ২০৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
প্রথম দফা সংশোধনের পর রেলপথটির পরামর্শক নিয়োগ করা হয়। তবে বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন করতে গিয়ে বেশকিছু পরিবর্তন আনতে হয়েছে। কিছু বিষয় নতুন যুক্তও হয়েছে। বেড়েছে একটি সেতুর উচ্চতায়ও। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন দুটি ছোট সেতু নির্মাণ করতে হয়েছে। নতুন করে জমি অধিগ্রহণ করতে হয়েছে। আর প্রকল্পটি বছরের পর বছর ঝুলে থাকা ও ঠিকাদার নিয়োগ বিলম্বিত হওয়ায় ব্যয় আরও বেড়েছে। এজন্য দ্বিতীয় দফা প্রকল্পটি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
২য় আরডিপিপি অনুযায়ী, ঢাকা-টঙ্গী রেলপথ ৩য় ও ৪র্থ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর ডাবল লাইন নির্মাণে ব্যয় হবে তিন হাজার ২৬৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ দুই দফায় ব্যয় বাড়ছে দুই হাজার ৪১৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা। সংশোধিত প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে ভারতের ঋণ ধরা হয়েছে দুই হাজার ৩৩২ কোটি ১৮ লাখ টাকা ও সরকারি তহবিল থেকে সরবরাহ করা হবে ৯৩৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১ম আরডিপিপির তুলনায় রেললাইন স্থাপনে ব্যয় বাড়ছে এক হাজার ৪৭৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রথম প্যাকেজের চুক্তিমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে এক হাজার ১৮৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা ও দ্বিতীয় প্যাকেজের চুক্তিমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ২৯০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। একইভাবে ১ম আরডিপিপির তুলনায় পরামর্শক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৬২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
এর বাইরে শুল্ককর খাতে ৮১ কোটি ২৭ লাখ টাকা, টেম্পিং মেশিন কেনায় ২৩ কোটি পাঁচ লাখ টাকা এবং প্রজেক্ট ইম্পিমেন্টশন ইউনিট (পিআইইউ) সম্পর্কিত ব্যয় বাড়ছে তিন কোটি ৯২ লাখ টাকা। আর জমি অধিগ্রহণ খাতে ব্যয় ১ম আরডিপিপির তুলনায় বাড়ছে ৫০০ কোটি টাকা। এছাড়া প্রকল্প ব্যয় আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় কনটিনজেন্সি খাতে ব্যয় বাড়ছে পাঁচ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।
এদিকে ২০১৪ সালে ১ম আরডিপিপি অনুমোদনের সময় ডলারের বিনিময় হার ছিল ৭৭ টাকা ৬৫ পয়সা। কিন্তু গত আট বছরে ডলারের বিনিময় হার অনেক বেড়েছে। আর ঠিকাদার ও পরামর্শকের সঙ্গে চুক্তি সই বৈদেশিক মুদ্রায়। এজন্য দুটি ঠিকাদার ও দুটি পরামর্শক চুক্তির মূল্য বেড়ে গেছে। এর মধ্যে প্রথম প্যাকেজের চুক্তি সই হয় ২০১৮ সালের ১৫ মার্চ। সে সময় ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল ৮২ টাকা ৯৪ পয়সা। দ্বিতীয় প্যাকেজের চুক্তি সই হয় ২০২১ সালের ১ নভেম্বর। সে সময় ডলারের বিনিময় মূল্য দাঁড়ায় ৮৫ টাকা ৭০ পয়সা।
একইভাবে প্রথম পরামর্শকের সঙ্গে চুক্তি সই হয় ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর। সে সময় ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল ৭৭ টাকা ৫৪ পয়সা। আর দ্বিতীয় পরামর্শক সেবার চুক্তি সই হয় ২০২২ সালের ৪ নভেম্বর। সে সময় ডলারের বিনিময় মূল্য বেড়ে দাঁড়ায় ৯৫ টাকা। সব মিলিয়ে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে গেছে।
জানতে চাইলে ঢাকা-টঙ্গী রেলপথ ৩য় ও ৪র্থ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক নাজনীন আরা কেয়া বলেন, প্রকল্পটির পরিকল্পনায় বেশকিছু পরিবর্তন আনতে হয়েছে। এজন্য ব্যয় বেড়েছে। এছাড়া ডলারের বিনিময় হার পরিবর্তন হয়েছে। শুল্ককর খাতেও ব্যয় বেড়েছে। এছাড়া পরামর্শকের মেয়াদকাল ও কর্মপরিধি বাড়ায় ওই খাতে ব্যয় বেড়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্ধিত ব্যয় সংস্থানে ভারত আগেই সম্মতি জানিয়েছে। আর প্রকল্পটির বেশকিছু কাজ এখনও কাজ বাকি রয়েছে। এজন্য মেয়াদকাল চার বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।




