গত ৫ জুন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোয় আগুন লাগার পর বিস্ফোরণ ও আগুনে পুড়ে মারা গেছেন ৪৯ জন। তাদের মধ্যে ৯ জনই ফায়ার সার্ভিসের সদস্য, যারা আগুন নেভাতে ও অন্য মানুষের প্রাণ বাঁচাতে ডিপোয় গিয়েছিলেন। কনটেইনার ডিপোর মূল কাজ হলো দৈনিক ভিত্তিতে কনটেইনারের জন্য জায়গা ভাড়া দেয়া এবং তা আদায় করা। বিএম কনটেইনার ডিপোর ভেতরে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অফিস আছে। সেখানকার কর্মকর্তারা ডিপোয় আমদানি-রপ্তানির কাজে সার্বক্ষণিক তদারকি করেন। নিয়ম অনুযায়ী তাদের অনুমোদন ছাড়া কনটেইনার তো পরের কথা, এক কেজি পণ্যও ডিপোয় প্রবেশ কিংবা বের করা অসম্ভব। এমনকি কনটেইনারের লক-আনলক করতেও তাদের অনুমতির প্রয়োজন হয়। কনটেইনার ডিপো যথানিয়মে অগ্নিনিরাপত্তা সামগ্রী সংরক্ষণ করছে কি না এবং অন্যান্য নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে কি না; তা দেখার জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষসহ কয়েকটি সংস্থা কাজ করে। তাই একটি দুর্ঘটনার জন্য শুধু কনটেইনার ডিপো কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা সঙ্গত নয়। যদি তাদের কোনো দায় থাকেও, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকের যোগসাজশও রয়েছে; এটি স্বাভাবিকভাবেই বলা যায়।
বিএম কনটেইনার ডিপোয় অগ্নিদুর্ঘটনা ও প্রাণহানির পর সমালোচনা কম হয়নি, এসেছে এ ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে পরামর্শও। সেগুলো আমলে নিয়ে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেই আমাদের বিশ্বাস। চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানিকৃত বিস্ফোরক এবং ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক রাসায়নিক পণ্য, কনটেইনারের সুরক্ষা, মনিটরিং ব্যবস্থা নিতে বলেছে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। বুধবার অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ লক্ষ্যে একটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়। কর্তৃপক্ষ একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রস্তুত করে সেটি প্রয়োগ করবে। সেই সঙ্গে পুরো কার্যক্রম তদারকি করবে।
আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী, সাধারণ পণ্যবোঝাই কনটেইনার ও রাসায়নিকের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যবোঝাই কনটেইনার একসঙ্গে থাকার কথা নয়। দেশের সরকারি-বেসরকারি কনটেইনার ডিপোয় যেন আন্তর্জাতিক গাইডলাইন পরিপালন করা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। পোশাক খাতে একাধিক দুর্ঘটনার পর বিদেশি ক্রেতাগোষ্ঠীর চাপে বাংলাদেশে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মপরিবেশ ও সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এর পর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে খাদ্যপণ্যের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে, সীতাকুণ্ডে কনটেইনার ডিপোয় অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণে প্রমাণ হয়েছে আমাদের অন্য খাতগুলোয় অনিয়ম, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর দায়িত্বহীনতা রয়েছে।
শ্রম আইন অনুযায়ী, বড় ধরনের কোনো স্থাপনা বা কারখানার অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু আইনে সব ধরনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও কার্যত কোনো কিছু মানা হয় না। কনটেইনার ডিপো তদারকির দায়িত্ব অনেকগুলো সরকারি কর্তৃপক্ষ ও প্রতিষ্ঠানেরÑবন্দর কর্তৃপক্ষ, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, কারখানা পরিদর্শন কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসন। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সুপারিশ মেনে এসব সংস্থা ও প্রশাসন তদারকি জোরদার করলে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানিকৃত বিস্ফোরক এবং ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক রাসায়নিক পণ্যের গুদাম এবং কনটেইনার ডিপোয় নিরাপত্তা সুরক্ষিত হবে। দেশের সর্বত্রই আমদানিকৃত বিস্ফোরক এবং ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক রাসায়নিক পণ্যের মজুত ও সরবরাহে একই নিয়ম অনুসৃত হলে দুর্ঘটনা কমবে বলেই প্রত্যাশা।