সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: প্রতি বর্ষায় বন্যায় নিচ এলাকার দোকান ও গুদামে পানি ওঠে। আর ঘূর্ণিঝড়ের সংঘটিত বৃষ্টি ও জোয়ারের প্রভাবে কয়েক ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায় এসব দোকান। গত বছর সিত্রাংয়ের প্রভাবে বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের প্রায় শতকোটি টাকার পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। এবার সুপার সাইক্লোন মোখার প্রভাব আরও ভয়াবহ হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে এ বছর বর্ষা মৌসুমের আগে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীসহ চট্টগ্রামের নিম্নাঞ্চলের ব্যবসায়ীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখা দিয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন এসব ব্যবসায়ী।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, এক সময় চাক্তাই খাল দিয়ে নৌপথে শত শত কোটি টাকার বাণিজ্য হতো। কালের পরিক্রমায় সেই চাক্তাই খাল চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের দুঃখে পরিণত হয়েছে। এছাড়া খালের দুই পাড়ে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, পলি জমে খাল ভরাট হয়ে যাওয়া এবং তলা পাকা করার কারণে স্থায়ীভাবে নাব্য হারিয়েছে চাক্তাই খাল। ফলে খালের পানির ধারণক্ষমতা কমে যায়। জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সময় দোকানগুদামের প্রবেশমুখও উঁচু করেন। কিন্তু প্রতি বছরই বাড়ে জোয়ারের পানির উচ্চতা। তবে শেষ পর্যন্ত জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থায়ী সমাধান হয়নি।
২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) চাক্তাই খালের কর্ণফুলী মোহনায় জোয়ারের পানি প্রতিরোধক সøুইসগেট নির্মাণ কাজ শুরু করে। কিন্তু প্রায় ৫ বছর হতে চললেও এখনও নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। ফলে এখনও ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। খাতুনগঞ্জ পাইকারি বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, মে থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত খাতুনগঞ্জে জোয়ারের পানিতে জলাবদ্ধতার প্রকোপ বাড়ে। অস্বাভাবিক পানি প্রতিরোধ সিডিএ সøুইসগেট নির্মাণকাজ শুরু করেছে, কিন্তু সেই কাজ পাঁচ বছরেরও শেষ না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা তার সুফল পাচ্ছেন না। এছাড়া নালা-নর্দমা ও খাল ভরাট হয়ে পানির ধারণ ক্ষমতা কমে গেছে। যে কারণে বিভিন্ন স্থানে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আর এখন ব্যবসায়ীরা চাইলেই তো হঠাৎ করে গুদামের মালামাল অন্যত্র সরাতে পারেন না। সবমিলিয়ে জলাবদ্ধতা নিয়ে আমরা আতঙ্গে থাকি।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোখা নিয়ে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে জোয়ারের পানির উচ্চতা বাড়ার পাশাপাশি নগরীর নি¤œাঞ্চল হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে তলিয়ে যায়। এছাড়া দোকান ও গুদামে পানি প্রবেশ করে ভোগ্যপণ্য নষ্ট হয়ে যায়। ২০১৭ সালে ঘূর্ণিঝড় মোরার প্রভাবে সৃষ্ট বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে ব্যবসায়ীদের প্রায় ৩০০ কোটি টাকার পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া গত বছরের অক্টোবরের শেষ দিকে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে ব্যবসায়ীরা প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েন। জোয়ারের পানি ও জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পেতে আমরা বারবার নালা-নর্দমা নিয়মিত পরিষ্কার করার পাশাপাশি কর্ণফুলী নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে পানির ধারণ ক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলাম। কিন্তু বিভিন্ন সমস্যার কারণে ড্রেজিংও হচ্ছে ধীরগতিতে। এছাড়া চাক্তাই ও রাজখালী খালের মোহনায় জোয়ারের পানি প্রতিরোধে সøুইসগেট নির্মাণকাজ এখনও শেষ হয়নি। তাই আমরা এখনও জলাবদ্ধতা নিয়ে আতঙ্কে আছি।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিআই) সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড় মোখা সুপার সাইক্লোনে পরিণত হতে পারে। তাই ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং জানমাল নিরাপদ রাখার লক্ষ্যে সকল স্থরের ব্যবসায়ীদের প্রস্তুত থাকতে হবে। বিশেষ করে চাক্তাই-খাতুনঘঞ্জ এলাকার ব্যবসায়ীরা প্রতি বছল বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আদা, রসুনসহ ব্যবসায়ীদের গুদামে সংরক্ষিত ভোগ্যপণ্য যাতে জলোচ্ছ্বাসে নষ্ট হতে না পারে এবং খাদ্যদ্রব্যের সংকট তৈরি না হয় সেই জন্য আগাম প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য ব্যবসায়ীদের সর্তক হতে হবে। আমরা চেম্বারও সার্বিক বিষয় নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।




