মীর কামরুজ্জামান মনি, যশোর:যশোর জেনারেল হাসপাতালে প্রতিদিনই বাড়ছে কলেরা রোগীর সংখ্যা। হাসপাতালে ডায়রিয়া নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীদের অধিকাংশই কলেরায় আক্রান্ত। ইতোমধ্যে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশু। এছাড়া বর্তমানে প্রতিদিন ৫০-এর অধিক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। গত চার মাস ধরে এ অবস্থা। এ অবস্থায় জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। তবে জেলা সিভিল সার্জন দাবি করেছেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে।
যশোর জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, চার মাস আগে যশোরে ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা দেয় এবং মার্চের শুরুতে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে রোগের কারণ নির্ণয়ে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর শরণাপন্ন হয় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। পরে গত ৩১ মার্চ আইইডিসিআরের একটি টিম যশোরে এসে কারণ অনুসন্ধান শুরু করে। দুই সপ্তাহ ধরে রোগী, রোগীর স্বজন, রোগী সংশ্লিষ্ট যশোর সদর ও চৌগাছা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পানিসহ বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে টিমটি। তাদের অনুসন্ধানে পৌরসভার সাপ্লাইয়ের পানি, ব্যক্তিগতভাবে বসানো সাবমারসিবল পাম্পের পানিতে কলেরার জীবাণু মেলে।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের সংক্রামক রোগীদের ছয়টি বেডের বিপরীতে সোমবার বিকাল পর্যন্ত রোগী ভর্তি রয়েছেন ৯২ জন। রোগীদের মধ্যে নারী-পুরুষ ও শিশু রয়েছেন।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের সংক্রামক ওয়ার্ডের ভর্তি কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হঠাৎ ডায়রিয়া শুরু হয়। সঙ্গে দফায় দফায় বমি হতে থাকে। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হন। হাসপাতালে ভর্তির পর এখন বেশ ভালো আছে। চিকিৎসক বলেছেন, দু’এক-দিনের মধ্যে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারব।
হাসপাতালের সংক্রামক ওয়ার্ডের সিনিয়র স্টাফ নার্স শারমিন আক্তার বলেন, ‘গত চার মাস ধরে হাসপাতালে ডায়রিয়া ও কলেরার রোগী আসছে। রোগীর প্রচুর চাপে সেবা দিতে হিমশিত খেতে হচ্ছে। রোগীর সঙ্গে অনেকে আসছেন। তারা একসঙ্গে থাকেন, একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করেন। পরে তারাও আক্রান্ত হন। তাদের বুঝিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না।’
চার মাস ধরে আমরা এসব রোগী নিয়ে ভুগছি উল্লেখ করে যশোর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আব্দুস সামাদ বলেন, ‘প্রথম দিকে শহরের কয়েকটি এলাকার রোগী ছিল। এখন বিভিন্ন উপজেলা থেকে রোগী আসছেন। চার মাস ধরে আমরা এসব রোগীকে সেবা দিয়ে যাচ্ছি।’
আরএমও বলেন, ‘গত রমজানে আইইডিসিআরের প্রতিনিধিদল যশোরে আসার পর যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে কলেরার জীবাণুর কথা উঠে এসেছে। কলেরা রোগীদের যে যে উপসর্গ থাকে, হাসপাতালে যেসব রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন; তাদের অনেকের সেসব উপসর্গ আছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের দেয়া প্রটোকল অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা চলছে।’
এ অবস্থায় জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. উবায়দুল কাদির উজ্জ্বল। তিনি বলেন, ‘আসলে কী কারণে এ রোগে এত বেশি সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন, আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। রোগীদের মধ্যে বেশিরভাগের শরীরে পানিশূন্যতা রয়েছে। এ কারণে তাদের রেনাল ফেইলুর বা অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। ধারণা করছি, পানিবাহিত কারণে আক্রান্ত বেশি হচ্ছেন তারা। এ অবস্থায় অল্প অসুস্থতায় হাসপাতালে না এসে বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নেয়া ভালো হবে। কেননা হাসপাতালে এটি একজনের থেকে অপরজনের মধ্যে ছড়াতে পারে। আক্রান্তদের খাবার স্যালাইন ও ডাবের পানি বেশি বেশি পানের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘তবে যাদের ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন বা কার্ডিয়াক সমস্যা রয়েছে, তাদের পরিস্থিতি এমন হলে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি হবে।’
যশোর জেলা সিভিল সার্জন ডা. বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস বলেন, ‘কিছুদিন ধরে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। রোগী বাড়ার কারণে আমরা আইইডিসিআরকে পরীক্ষা করার জন্য বলেছিলাম। তাদের টিম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আমাদের জানিয়েছেন, পানি থেকে এই রোগ ছড়াচ্ছে। তাদের এই রিপোর্টের বিষয়টি আমরা জেলা প্রশাসক ও পৌরসভাকে জানিয়েছি। পৌরসভা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকায় তাদের পাইপ পরীক্ষা শুরু করেছে এবং লিকেজগুলো মেরামত করছে।’
সিভিল সার্জন ডা. বিপ্লব কান্তি বলেন, ‘ইতোমধ্যে হাসপাতালে রোগীদের জন্য আমরা একটি ওয়ার্ড খুলেছি। প্রতিদিনই রোগী বাড়ছে। তবে, আমাদের আমাদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি আছে। পরিস্থিতি আমাদের আওতার বাইরে যায়নি এখনও। ওষুধ, স্যালাইন সবকিছু পর্যাপ্ত আছে।’




