রোহান রাজিব: ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধে আবারও সুবিধা চেয়েছে ব্যবসায়ীরা। আগামী ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঋণ পরিশোধে ছাড় চাওয়া হয়। একই সঙ্গে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) আকার ও কিস্তি পরিশোধের সময়ও বৃদ্ধি চাওয়া হয়। এই দুই ক্ষেত্রে সুবিধা চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস্ অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। এ নিয়ে আজ বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু ফারাহ মো. নাছেরের সঙ্গে সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা বৈঠকে বসবেন। বৈঠকে তাদের এসব দাবি জানাবেন বলে সূত্র মতে জানা গেছে।
চিঠিতে বলা হয়, রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল থেকে বিটিএমএ’র জন্য ঋণ পাওয়ার আকার ৩০ মিলিয়ন থেকে কমিয়ে ২০ মিলিয়ন ডলারে করা হয়েছে এবং ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ২৭০ দিন থেকে কমিয়ে ১৮০ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু তুলা আমদানি থেকে সুতা তৈরি এবং তা সরবরাহের পর সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে রপ্তানি মূল্য পেতে ২০০-২২০ দিনের মতো সময় লাগে। ফলে ১৮০ দিনের মধ্যে মিলগুলোর পক্ষে ওই তহবিল থেকে গৃহীত ঋণ পরিশোধে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
রপ্তানি খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদ ও সহজ শর্তে অর্থায়ন করতে এই তহবিল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে করা হয়েছে। তবে এই তহবিলের অর্থও রিজার্ভে দেখিয়ে আসছে বাংলাদেশ, যা নিয়ে আপত্তি তুলেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি থেকে নেয়া ঋণের শর্ত অনুযায়ী রিজার্ভ থেকে ইডিএফসহ সব ধরনের তহবিল বা দায় আলাদা করতে রাজি হয়েছে বাংলাদেশ। তারপর থেকে ইডিএফের আকার কমিয়ে আনা ও ঋণসীমা কমানোসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। গত জানুয়ারি মাসে ঋণের সুদহার সাড়ে ৪ শতাংশে উন্নীত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়া অনদায়ী অর্থের ওপর অতিরিক্ত ৪ শতাংশ দণ্ড সুদও আরোপ করা হয়েছে। গত মে মাসে ইডিএফের আকার কমে ৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে বস্ত্র কারখানাগুলোর পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকার কারণে উৎপাদন ক্ষমতার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যবহার করতে পরাছে না। ফলে মিলগুলোতে তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে। অপরদিকে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ ও ডলার সংকটসহ অন্যান্য কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এছাড়া তৈরি পোশাকের রপ্তানি আয় প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে; যার প্রভাব টেক্সটাইল খাতেও পড়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর টার্ম লোনসহ অন্যান্য ঋণ পরিশোধে কষ্টকর হয়ে পড়ছে। তাই মিলের ব্যাংক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময় চেয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন শেয়ার বিজকে বলেন, আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ইডিএফ ও টার্ম লোনের বিষয়ে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছি। তা নিয়ে আজ আলোচনা হবে। আমরা ২০২৪ সাল পর্যন্ত টার্ম লোনের কিস্তি পরিশোধে সুবিধা চেয়েছি। আর ইডিএফ নিয়ে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক আলোচনা করবে। আলোচনার মাধ্যমে কিছু করা যায় কি না সেটাই বাংলাদেশ ব্যাংকে বলব।
উল্লেখ্য, ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন সময় ঋণের কিস্তি পরিশোধে নানা রকম ছাড় দিয়ে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। করোনার প্রভাব শুরুর পর ২০২০ সালে ঋণ পরিশোধে অভিনব ছাড় দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই বছর ঢালাওভাবে ঋণ পরিশোধ না করেও খেলাপিমুক্ত থাকার সুযোগ দেয়া হয়। ২০২১ সালে যে পরিমাণ ঋণ পরিশোধ করার কথা ছিল, তার মাত্র ১৫ শতাংশ দিলেই তাদের নিয়মিত দেখানো হয়। এরপর ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে একজনের যে পরিমাণ ঋণ পরিশোধ করার কথা ছিল, তার মাত্র ৫০ শতাংশ দিলেই তাকে আর খেলাপি করা হয়নি। এর মধ্যে গত বছরের জুলাইতে ঋণ পুনঃতফসিল নীতিমালা ব্যাপক শিথিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখানে ডাউনপেমেন্ট, মেয়াদসহ বিভিন্ন বিষয় শিথিল করা হয়। আর গত ২০ জুন আরেক দফা ছাড় দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, গত ১ এপ্রিল থেকে বিদ্যমান নিয়মিত মেয়াদি প্রকৃতির ঋণের (স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্রঋণসহ) বিপরীতে এপ্রিল-জুন সময়ের জন্য যে কিস্তি দিতে হবে, তার ৫০ শতাংশ পরিশোধ করলেই গ্রাহককে খেলাপি করা যাবে না।
ব্যাংকাররা বলেন, এমন ছাড়ের কারণে ভালো গ্রাহকরাও ঋণ পরিশোধে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এতে ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে পড়ছে এবং নতুন ঋণ দেয়ার ক্ষমতা হারাচ্ছে। গত মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে ১ লাখ ৩১ হাজার ৬২০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।