শুল্ক মুক্ত সুবিধার গমের ভুসি বাজারে, ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় শিল্প

রহমত রহমান: গম থেকে আটা, ময়দা ও সুজির পাশাপাশি উপজাত হিসেবে ভুসি উৎপন্ন হয়। অনেক ক্ষেত্রে আটা, ময়দা ও সুজি উৎপাদনের সময় ২৫ থেকে ২৮ শতাংশ ভুসি উৎপাদিত হয়। দেশে প্রতিবছর ৬৫ থেকে ৭০ লাখ মেট্রিক টন গমের সরবরাহ থাকে। এ গম থেকে ২৫ শতাংশ ভুসি উৎপাদিত হলেও দেশে ভুসির চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন। দেশের আটা, ময়দা, সুজি উৎপাদন ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান ভুসির চাহিদার বেশিরভাগ জোগান দিতে পারে। এছাড়া দেশে আটা-ময়দা উৎপাদনকারী মিলেও ভুসি উৎপাদিত হয়। দেশীয় প্রতিষ্ঠান ও মিল দেশের ভুসির চাহিদা অনুযায়ী ভুসি উৎপাদন করলেও বেশিরভাগ ভুসি বিক্রি হচ্ছে না। কারণ দেশে বাণিজ্যিকভাবে মাত্র পাঁচ শতাংশ অগ্রিম দিয়েই ভুসি আমদানি করা হচ্ছে। আবার পোলট্রি ও গো-খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান উৎপাদন ক্ষমতার অতিরিক্ত আমদানি করছে, যা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মোড়ক নকল করে বাজারজাত করা হচ্ছে। এতে একদিকে সরকার রাজস্ব পাচ্ছে না, অন্যদিকে স্থানীয় ভুসি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, দেশে উৎপাদিত ভুসি অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে।

শুল্কমুক্ত সুবিধার অপব্যবহার রোধে ভুসি আমদানিতে শুল্কারোপ, রেয়াতি সুবিধা নেয়ার ক্ষেত্রে তদারকি বৃদ্ধি ও প্রাপ্যতা নেয়ার ক্ষেত্রে যাচাই করার সুপারিশ করা হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনে ‘গমের ভুসি আমদানিতে শুল্কহার পর্যালোচনা বিষয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় চারটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সভায় কমিশনের চেয়ারম্যান মো. ফয়জুল ইসলাম সভাপতিত্ব করেন। সভায় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, সমিতির প্রতিনিধি ও দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভার শুরুতে কমিশনের উপ-প্রধান কার্যপত্র উপস্থাপন করে বলেন, দেশের আটা, ময়দা, সুজি ও গমের ভুসির চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশ থেকে গম আমদানি করে থাকে। মূলত ইউক্রেন, রাশিয়া, ভারত ও পাকিস্তানসহ আফ্রিকার কয়েকটি দেশ থেকে গম আমদানি করে থাকে। ভারতে স্থানীয় চাহিদায় ঘাটতি থাকায় গম রপ্তানিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ভারত থেকে গম রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও গমের উপজাত পণ্য  ভুসি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা নেই। গম থেকে মূল পণ্যগুলো হচ্ছে আটা, ময়দা ও সুজি, যা উৎপাদনের সময় উপজাত পণ্য হিসেবে ২৫ থেকে ২৮ শতাংশ পর্যন্ত গমের ভুসি পাওয়া যায়। গম থেকে আটা, ময়দা ও সুজি উৎপাদনপূর্বক মূল্য নির্ধারণকালে এ শিল্পের উপজাত পণ্য হিসেবে প্রাপ্ত গমের ভুসি ও আটার বাজারমূল্য সমানভাবে বিবেচনায় রাখা হয়। সে অনুসারে মূল্য সমন্বয় করা হয়। স্থানীয় বাজারে গমের ভুমি ও আটার বাজারমূল্য সমানভাবে নির্ধারিত হয়ে থাকে। দেশে প্রতি বছর ৬৫ থেকে ৭০ লাখ মেট্রিক টন হমের সরবরাহ থাকে। এর ২৫ শতাংশ ভুসি উৎপাদিত হলে স্থানীয় ভুসির চাহিদা প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছর প্রায় ২০ লাখ মেট্রিক টন গম কম আমদানি হয়েছে। সে হিসেবে চার লাখ মেট্রিক টন ভুসি সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। স্থানীয় সরবরাহ ঠিক রাখতে হলে ঘাটতি থাকা ভুসির আমদানি বৃদ্ধির বিষয়টি যৌক্তিক বলে তিনি জানান।

সভায় সিটি গ্রুপের উপদেষ্টা অমিতাভ চক্রবর্তী বলেন, গম থেকে উৎপাদিত আটা, ময়দা ও সুজির ন্যায় ভুসিও একটি পণ্য। কারণ ২৮ থেকে ৩০ শতাংশ পণ্যকে উপজাত পণ্য হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই। ৩০ শতাংশ পণ্য যথাযথ মূল্যে বিক্রি করতে না পারলে বাকি ৭০ শতাংশের ওপর প্রভাব পড়ে। আটা ও ময়দার মূল্য নির্ধারণকালে এ শিল্পের উপজাত পণ্য হিসেবে প্রাপ্ত গমের ভুসি বাজারজাতকরণের মাধ্যমে প্রাপ্ত আয়কে বিবেচনায় নিয়েই মূল্য সমন্বয় করা হয়। সেজন্য কম শুল্কে যদি ভারত থেকে ভুসি আমদানি হয়, তাহলে স্থানীয় আটাকলগুলো রুগ্ণ হবে। সেই সঙ্গে ভোক্তাদের বেশি মূল্যে আটা ও ময়দা কিনতে হবে। এতে দেশের মূল্যস্ফীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

নারায়ণগঞ্জ আটা-ময়দা মিলস মালিক সমিতির প্রতিনিধি উজ্জ্বল পাঠান বলেন, দেশে প্রায় ৪২৮টি আটা-ময়দার মিল রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৬০ থেকে ৭০টি চালু রয়েছে। আটা-ময়দা উৎপাদনের সময় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ গমের ভুসি উৎপন্ন হয়, যা অপসারণ না করা হলে আবার আটা-ময়দা উৎপাদন করা যায় না। নি¤œমানের গমের ভুসি আমদানি করে তা দেশীয় স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের ব্যাগে বাজারজাত করার ফলে এসব মিল থেকে উৎপন্ন গমের ভুসি অবিক্রীত থেকে যায়। ফলে একদিকে যেমন আটা-ময়দার দাম বৃদ্ধি পায়; অন্যদিকে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

মেঘনা গ্রুপের প্রতিনিধি তসলিম শাহরিয়ার জানান, ভারত থেকে আমদানি করা ভুসি বাংলাদেশে পৌঁছাতে যে সময় লাগে, তাতে ভুসির গুণগত মান ঠিক থাকে না। এছাড়া ভারত থেকে আমদানি করা ভুসির গুণগতমান ভালো নয়। ভুসিতে প্রচুর পরিমাণ বালি ও অন্যান্য বর্জ্য পাওয়া যায়, যা গো-খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

আকিজ ফ্লাওয়ার মিলস লিমিটেডের প্রতিনিধি শামসুল ইসলাম বলেন, ১০০ মেট্রিক টন গম থেকে ৩০ মেট্রিক টন ভুসি উৎপাদন হয়, যার ফলে আটার উৎপাদন কমে এবং আটার বাজারমূল্য বৃদ্ধি পায়। এক্ষেত্রে ভুসির মূল্য কমানো উচিত। বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতিনিধি রেদওয়ান রহমান বলেন, গম মিলিংকালে যে কয়টা পণ্য পাওয়া, তার মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে ভুসি। কিন্তু গম থেকে উৎপাদিত পণ্য আটা-ময়দা ও সুজি আমদানিতে যে হারে শুল্কারোপ করা হয়েছে, ভুসি আমদানিতে তার চেয়ে অনেক কম হারে শুল্কারোপের ফলে ভুসি আমদানি হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে ভুসির যে চাহিদা তা স্থানীয় উৎপাদন দ্বারা পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু ভুসি আমদানির ফলে গমের মিলিং কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় এ শিল্প সুরক্ষায় শুল্ক সহায়তা অতি জরুরি।

ইফাদ ফ্লাওয়ার মিলসের প্রতিনিধি জামাল রাজ্জাক বলেন, দেশে বড় বড় আটাকলের পাশাপাশি ছোট প্রায় পাঁচ শতাধিক আটাকল রয়েছে। যেখানে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ভারত থেকে গম রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারির ফলে উপজাত পণ্য ভুসির মূল্য হ্রাস পেয়েছে। দেশে চাহিদা থাকায় তা আমদানির ফলে স্থানীয় শিল্পকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। স্থানীয় এ শিল্প সুরক্ষায় আটা-ময়দা ও সুজির মতো ভুসি আমদানিতেও সমান হারে শুল্কারোপ করা প্রয়োজন।

নারায়ণগঞ্জ আটা-ময়দা মিলস মালিক সমিতির সভাপতি জসিম উদ্দিন মৃধা বলেন, দেশে পোলট্রি ও গো-খাদ্যের কাঁচামাল হিসেবে গমের ভুসি আমদানিতে কোনো প্রকার শুল্কারোপিত নেই। ফলে ভ্যাট নিবন্ধিত অনেক পোলট্রি ও গো-খাদ্য উৎপাদনকারী শিল্প কাঁচামাল হিসেবে উৎপাদন ক্ষমতার অতিরিক্ত ভুসি আমদানি করে কম দামে বাজারজাত করে। ফলে স্থানীয় ভুসি অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে। উৎপাদন ক্ষমতার অতিরিক্ত যাতে ভুসি আমদানি করতে না পারে, সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

এফবিসিসিআইয়ের সিনিয়র অতিরিক্ত মহাসচিব শাহ মো. আবদুল খালেক বলেন, গমের উপজাত পণ্য আমদানির ফলে যদি মূল পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায় এবং সে বৃদ্ধির ফলে যদি খাদ্য নিরাপত্তায় ঝুঁকির সৃষ্টি করে, সেক্ষেত্রে এ ধরনের পণ্য আমদানিতে শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা উচিত। শুধু তা-ই নয়, আমদানি করা পণ্যের গুণগত মান আমদানি মূল্য ও শুল্কায়নযোগ্য মূল্য সেই সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদন ব্যয় বিবেচনা করে শুল্ক কাঠামো যুগোপযোগী করতে হবে। দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সংরক্ষণের পাশাপাশি ভোক্তার স্বার্থ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সভায় এনবিআরের প্রথম সচিব খন্দকার নাজমুল হক বলেন, শুল্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মকানুন মেনে শুল্ক নির্ধারণ করা হয়। কোনো পণ্য আমদানিতে ট্যারিফ ভ্যালু ও শুল্কায়নযোগ্য মূল্য সুনির্দিষ্ট করা হলে তা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ে পণ্যের আমদানিমূল্যকে ভিত্তি ধরে শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ঠিক করা হয়। শিল্প কাঁচামাল হিসেবে ভুসি আমদানির ফলে স্থানীয় আটা উৎপাদনকারী শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে বাণিজ্যিক আমদানিতে যেহেতু পাঁচ শতাংশ অগ্রিম কর ব্যতীত অন্য কোনো শুল্ক নেই। তাই বাণিজ্যিক আমদানির কারণে যেন দেশীয় আটা উৎপাদনকারী শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য শুল্ক পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব পাঠানো হলে এনবিআর বিবেচনা করতে পারে।

অন্যদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উপ সচিব শারমিন ইয়াসমিন বলেন, কোনো কোনো পণ্যের আমদানির ফলে মানুষের বেসিক ফুডের মূলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সেক্ষেত্রে এ ধরনের পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিতকরণে সরকার শুল্কারোপ করতে পারে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপ সচিব নূর-ই-খাজা আলামীন বলেন, দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সংরক্ষণ করা শিল্প মন্ত্রণালয়ের অন্যতম একটি কাজ। গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য আমদানি না হলে দেশ সার্বিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের ভুসির গুণগত মান নির্ধারণ করা থাকলে বিএসটিআই সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শরীফুল ইসলাম বলেন, আমদানি করা ভুসি স্থানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মোড়ক নকল করে বাজারজাত করলে তা আইনের লঙ্ঘন। এ ধরনের বিষয় থাকলে সে অনুযায়ী অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ট্যারিফ কমিশনের সদস্য মো. ওয়াদুদ হোসেন বলেন, আমদানি করা পণ্যের উৎপাদন খরচ-সংক্রান্ত তথ্য উপস্থাপন করা প্রয়োজন। এছাড়া স্থানীয় উৎপাদনকারীর উৎপাদন খরচ বিবেচনায় নিয়ে শুল্কারোপ করা হলে তা বাস্তবসম্মত হবে।

সভায় চারটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রথমত, দেশীয় আটা-ময়দা উৎপাদনকারী শিল্প সুরক্ষায় গমের ভুসির বাণিজ্যিক আমদানিতে গম থেকে প্রাপ্ত অন্যান্য পণ্য আটা-ময়দা ও সুজির মতো সমহারে শুল্কারোপে এনবিআর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। দ্বিতীয়ত, রেয়াতি শুল্কে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করা ভুসি যেন স্থানীয় বাজারে বাজারজাত করতে না পারে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেটকে এনবিআর প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করতে পারে। তৃতীয়ত, আমদানি করা গমের ভুসি বাজারজাত করার ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদনকারী মোড়ক যেন নকল করতে না পারে, সে বিষয়ে বিএসটিআই ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। চতুর্থত, শিল্প কাঁচামাল হিসেবে ভুসির বাণিজ্যিক ব্যবহার রোধে বিডা পোলট্রি ও গো-খাদ্যের কাঁচামাল হিসেবে গমের ভুসি আমদানির প্রাপ্যতা নির্ধারণে উৎপাদন ক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে প্রাপ্যতা নির্ধারণ করতে পারে।