রহমত রহমান: দেশের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে রয়েছে ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শাখা। ভবন বা ফ্লোর ভাড়া নিয়ে এসব শাখা পরিচালিত হয়। দেশে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক, বেসরকারি ব্যাংক, বিদেশি ও তফসিলবহির্ভূত ৬৬টি ব্যাংক রয়েছে। এসব ব্যাংকের শাখার সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার ১৫টি। আবার ৩৫টি নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ৩৫টি জীবন বিমা ও ৪৬টি সাধারণ বিমার শাখার সংখ্যা প্রায় তিন হাজার ৪৯টি। ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শাখা হিসেবে ভাড়া দেয়া এসব ভবন বা ফ্লোর মালিকের অনেকের ই-টিআইএন নেই। আবার ই-টিআইএন থাকলেও রিটার্ন দেয় না। রিটার্ন দিলেও অনেকেই ভাড়ার সঠিক হিসাব দেয় না।
নতুন করদাতা শনাক্তের অংশ হিসেবে ব্যাংক, বিমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে শাখা ভাড়া দেয়া এসব ভবন বা ফ্লোর মালিককে করের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সেজন্য ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শাখা ভাড়া দেয়া ভবন বা ফ্লোর মালিকদের তথ্য দিতে কর অঞ্চলগুলোকে চিঠি দেয়া হয়েছে। এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, ভবন বা ফ্লোর মালিকদের এ তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে একদিকে ই-টিআইএন ও রিটার্ন দাখিল বাড়বে, অন্যদিকে যেসব মালিক রিটার্নে ভবন ও ভাড়ার তথ্য গোপন করতেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাবে।
এনবিআর সূত্রমতে, দ্বিতীয় সচিব (কর-১৫) মীর মো. আরিফ হোসেন সই করা চিঠি দেয়া হয়। সব কর অঞ্চলের কমিশনারকে এ চিঠি দেয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়, নতুন করদাতা বৃদ্ধিতে এনবিআর সাম্প্রতিক অর্থ আইনসমূহ ও নতুন আয়কর আইন, ২০২৩ এর মাধ্যমে নীতিসহায়তা দিয়েছে। এ নীতি সহায়তার সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে মাঠ কর অফিসগুলো ‘নতুন নতুন করদাতাদের ই-টিআইএন গ্রহণে উদ্বুদ্ধ’ ও ‘ই-টিআইএন নিবন্ধনভুক্ত করদাতাদের আয়কর রিটার্ন দাখিলে উদ্বুদ্ধ’ করার মাধ্যমে করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি করা সম্ভব বলে এনবিআর মনে করে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংক, বেসরকারি ব্যাংক, বিদেশি ব্যাংক, তফসিলবর্হিভূত ব্যাংক, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান, জীবন বিমা, সাধারণ বিমার শাখাগুলোর সারাদেশে শাখা রয়েছে। কোথাও ভবন বা কোথাও ফ্লোর ভাড়া নিয়ে এসব শাখা পরিচালিত হচ্ছে। ভবন বা ফ্লোর বা গৃহসম্পত্তি ভাড়ার ওপর ৫ শতাংশ হারে উৎসে কর প্রযোজ্য। ভাড়া দেয়া এসব ভবন বা ফ্লোর মালিকদের অনেকের ই-টিআইএন নেই। আয়কর রিটার্ন দেয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে ভবন বা ফ্লোর মালিকের ই-টিআইএন নেই। আবার ই-টিআইএন থাকলেও রিটার্ন দেয় না।
চিঠিতে কর কমিশনারদের নির্দেশনা দিয়ে বলা হয়েছে, ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে ভাড়া দেয়া ভবন বা গৃহসম্পত্তি মালিকদের সম্পাদিত চুক্তির কপি কর অফিসে সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে; যা এনবিআর চাইলে প্রেরণ করতে হবে। আর যেসব গৃহস্পত্তি বা ভবন মালিকের ই-টিআইএন নেই, তাদের ই-টিআইএন নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। এছাড়া শাখাগুলো যে তারিখ থেকে ভাড়া দেয়া হয়েছে সে তারিখ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ভাড়ার ওপর প্রযোজ্য উৎসে কর আদায়। যেসব মালিক রিটার্ন দেন না, তাদের রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করতে হবে। এনবিআর গঠিত ‘জরিপ সংক্রান্ত টাস্কফোর্স’-এর সদস্যরা কর অফিসগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করবেন। পরিদর্শনের সময় ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শাখার ভাড়া দেয়া গৃহসম্পত্তির মালিকদের তথ্য ছক আকারে কর অফিসকে রাখতে কর অফিসকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে; যাতে টাস্কফোর্স তথ্যের সঠিকতা যাচাই করতে পারেন। চিঠির সঙ্গে ১৮৫টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সারাদেশের শাখাগুলোর নাম, ঠিকানাসহ তালিকা কর অফিসকে ই-মেইলে পাঠানো হয়েছে। আগামী ২০ অক্টোবরের মধ্যে এনবিআরকে তথ্য পাঠাতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
চিঠির সঙ্গে দেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিশেষায়িত ব্যাংক, বেসরকারি ব্যাংক, বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক, তফসিলবহির্ভূত ব্যাংক, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা, জীবন বিমা কোম্পানি বা করপোরেশন, সাধারণ বিমা কোম্পানি বা করপোরেশনের তালিকা দেয়া হয়েছে। এছাড়া এসব ব্যাংক, বিমার সব শাখার ঠিকানাসহ তালিকা দেয়া হয়েছে। এসব শাখার কাছে ভাড়া দেয়া ভবনের মালিকদের ভাড়া পরিশোধের সময় উৎসে কর কর্তন করা হয়েছে কি না, ভবন মালিকদের ই-টিআইএন রয়েছে কি না, ই-টিআইএন থাকলে রিটার্ন দাখিল করেন কি নাÑএসব যাচাই করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে যাদের ই-টিআইএন তাদের ই-টিআইএন নিবন্ধন ও রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করতে কমিশনারদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া ভাড়ার ওপর উৎসে কর্তন নিশ্চিত করতেও বলা হয়েছে।
তালিকায় দেখা গেছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও বেসরকারি ৫২টি ব্যাংকের মোট ১১ হাজার ৭৮৬টি শাখা রয়েছে। এছাড়া বিদেশি নয়টি ও তফসিলবর্হিভূত পাঁচটি ব্যাংকের মোট এক হাজার ২২৯টি শাখা রয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে। এসব ব্যাংকের মধ্যে সোনালী ব্যাংকের সারাদেশে শাখা রয়েছে এক হাজার ২২২টি। এছাড়া জনতার ৯২২টি, অগ্রণীর ৯৭১টি, রূপালীর ৫৮৬টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ৫৯টি ও বেসিক ব্যাংক লিমিটেডের ৭২টি শাখা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তিনটি বিশেষায়িত ব্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এক হাজার, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ২৬টি ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ১২১টি শাখা রয়েছে। দেশীয় মালিকানাধীন ৪৩টি বেসরকারি ব্যাংক রয়েছে। এসব ব্যাংকের মধ্যে পূবালী ব্যাংকের শাখা ৫০০। এছাড়া উত্তরার ২৪৫, এবি ব্যাংকের ১০৪, ন্যাশনাল ২২১, সিটি ব্যাংক ১৪৮, ইসলামী ব্যাংক ৩৯৪, আইএফআইসি ১৮৪, ইউসিবি ৩৫৬, আইসিবি ৩৩, ইস্টার্ন ৩৩, এনসিসি ১২৬, প্রাইম ১৫০, সাউথইস্ট ১৩৭, ঢাকা ব্যাংক ১৩৬, আল-আরাফা ২৫৮, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ১৭৯, ডাচ্বাংলা ২৪০, মার্কেন্টাইল ১৫১, স্ট্যান্ডার্ড ১৩৮, ওয়ান ১১১, এক্সিম ১৪৮, কর্মাস ব্যাংক ১০৬, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ৫৪, ফার্স্ট সিকিউরিটি ২০৪, প্রিমিয়ার ১৩২, ব্যাংক এশিয়া ১৩৬, ট্রাস্ট ব্যাংক ১১২, শাহজালাল ইসলামী ১৪৫, যমুনা ১২৩, ব্র্যাক ১৮৭, পদ্মা ১৫৬, মেঘনা ৪৭, মিডল্যান্ড ৩৯, সাউথ বাংলা ৬১, গ্লোবাল ইসলামী ২২৪, মধুমতি ৪৮, এনআরবি ৭৪, এনআরবি কমার্শিয়াল ৭৪৩, ইউনিয়ন ১১২, সীমান্ত ২৪, কমিউনিটি ব্যাংক ১৮, বেঙ্গল ২১ ও সিটিজেন ব্যাংক ৬টি শাখা রয়েছে।
অপরদিকে, বিদেশি ৯টি ব্যাংকের মোট ২৭০টি শাখা রয়েছে। এর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ২০, হাবিব ছয়টি, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া পাঁচটি, সিলন ২০, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান চার, সিটি ব্যাংক এনএ ১৪৮, উরি ৫৯, এইচএসবিসি সাত, ব্যাংক আলফালাহ সাতটি শাখা রয়েছে। তফসিলবহির্ভূত পাঁচটি ব্যাংকের মোট ৯৫৯টি শাখা রয়েছে। এর মধ্যে আনসার-ভিডিপির ২৪৭, সমবায় একটি, গ্রামীণ একটি, কর্মসংস্থান ২২০ ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ৪৯০টি শাখা রয়েছে।
হিসেবে আরও দেখা গেছে, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৩৬টি। সারাদেশে এই ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের শাখা সংখ্যা ৪৩৫টি। বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স একাডেমি নামে দুটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ৩৫টি জীবন বিমা কোম্পানি রয়েছে। এদের সারাদেশে এক হাজার ৪১৩টি শাখা রয়েছে। ৪৬টি সাধারণ বিমা কোম্পানি রয়েছে। সারাদেশে এদের এক হাজার ১৯৯টি শাখা রয়েছে। নন-ব্যাংক ৩৬টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ৩৫টি জীবন বিমা ও ৪৬টি সাধারণ বিমার সারাদেশে মোট তিন হাজার ৪৯টি শাখা রয়েছে।
এনবিআর সূত্রমতে, এনবিআর থেকে তথ্য চেয়ে চিঠি দেয়ার পর কর অঞ্চলগুলো ঠিকানা অনুযায়ী তাদের অধিক্ষেত্রাধীন ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করা শুরু করেছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১৩-১৪টি কর অঞ্চল থেকে তথ্য যাচাই করে এনবিআরে তালিকা পাঠানো হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব কর অঞ্চল তালিকা পাঠাবে বলে এনবিআর সূত্র জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেয়ার বিজকে বলেন, ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সারাদেশে শাখা রয়েছে। ভবন বা ফ্লোর ভাড়া নিয়ে এসব শাখা পরিচালিত হয়। আয়কর আইন অনুযায়ী গৃহসম্পত্তির ভাড়ার ওপর ৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তন করতে হয়। আবার এসব ভবন বা ফ্লোরের ভাড়াও কম নয়। প্রতিটি শাখার ভবন বা ফ্লোর মালিকদের তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত হতে পারব কোন মালিকের ই-টিআইএন নেই, রিটার্ন দেয় না। যাদের ই-টিআইএন নেই, তাদের ই-টিআইএন নিবন্ধন দেয়া হবে; রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করা হবে। এতে একদিকে নতুন করদাতা বাড়বে, অন্যদিকে কর আদায় নিশ্চিত হবে। আবার যেসব ভবন বা ফ্লোর মালিক রিটার্ন দাখিল করেন, কিন্তু ভবন বা ফ্লোরের আয় সঠিকভাবে রিটার্নে দেখান না। তাদের বিরুদ্ধেও কর অফিস ব্যবস্থা নিতে পারবে। সব কর অঞ্চল থেকে তথ্য পাওয়ার পর এনবিআর থেকে পরবর্তী নির্দেশনা দেয়া হবে। তবে মাঠ কর অফিস করদাতা বাড়াতে এনবিআরের এই নির্দেশনা পাওয়ার পর কাজ শুরু করে দিয়েছেন।