প্রবীণদের অধিকার আদায়ে নাগরিক সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ

এমএ কাদের: গত ১ অক্টোবর দেশে নানা আয়োজন-অনুষ্ঠানে পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। জরা বা বার্ধক্য জীবনের এক চরম সত্য। শৈশবের সোনালি সকাল শেষ করে, তারুণ্য আর যৌবনের রোদেলা দুপুর পাড়ি দিয়ে, মাঝ বয়সের ব্যস্ত বিকালটাও যখন চলে যায়, তখনই জীবনসায়াহ্নের গোধূলিবেলা জুড়ে আসে বার্ধক্য। বর্তমান সমাজে সবচেয়ে অবহেলার শিকার এখন অসহায় প্রবীণরাই, কিন্তু ক্রমবর্ধমান বার্ধক্যের অসহায়ত্ব মোকাবিলা করার মতো দরকারি প্রস্তুতি আমাদের নেই। অরক্ষিত এই প্রবীণদের সেবা দেয়ার জন্য যে নতুন-নতুন ব্যবস্থা প্রয়োজন তা গড়ে উঠছে না। অসহায় প্রবীণদের কল্যাণের বিষয়ে এখনই আমাদের উদ্যোগী হওয়া জরুরি। কেননা বার্ধক্য হচ্ছে প্রতিটি মানুষের অবধারিত সমস্যা। আজকের নবীনই আগামী দিনের প্রবীণ। তাই শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রবীণদের দেখভাল করতে হবে। আর এখন থেকেই নিজেদের স্বস্তিময় বার্ধক্যের প্রস্তুতি নিতে হবে। দয়া-দাক্ষিণ্য বা করুণার দৃষ্টিতে নয়, মানবাধিকারের ভিত্তিতে এবং প্রাপ্য মর্যাদার যুক্তিতে প্রবীণদের চাওয়া-পাওয়ার সমাধান করা প্রয়োজন। এর জন্য দরকার গণসচেতনতা, আর এই গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রবীণদের অবহেলা, অযতœ, দুর্ব্যবহার, নির্যাতনের ঘটনা এবং সবার করণীয় বিষয়গুলোর সব শিক্ষা পাঠ্যসূচিতে এবং গণমাধ্যম কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে পারলে প্রবীণদের প্রতি কিছুটা হলেও সম্মান প্রদর্শন করা হবে।

মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৯৯০ সালে বিশ্বে প্রবীণদের সংখ্যা ছিল ৫০ কোটি। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১০ কোটিতে। ২০৩০ সালে এর সংখ্যা হবে ১৫০ কোটি এবং ২০৫০ সালে প্রবীণদের সংখ্যা ২০০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশে বর্তমান প্রবীণদের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। ২০২৫ সালে প্রবীণদের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় দুই কোটিতে। ২০৫০ সালে প্রবীণসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় সাড়ে চার কোটিতে। জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের মতে ২০৬০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে অপ্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় প্রবীণদের সংখ্যা বেশি হবে। এক বেসরকারি জরিপে জানা গেছে, বর্তমান বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লাখ প্রবীণ অসুস্থ, অসহায়, অবহেলিত, নিঃসঙ্গ ও সেবাহীন মানুষ জীবনযাপন করছেন।

সামাজিক মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় অনুশাসনের অভাবে আমাদের দেশে বৃদ্ধ বাবা-মা কত যে অসহায় অবস্থায় জীবনযাপন করছেন, বাইরে থেকে সেটা বোঝা যায় না। অনেক সময় বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাড়ি পাহারা, সন্তান দেখাশোনা, বাজার করানো, সন্তানকে স্কুলে পাঠানো, ধমক দিয়ে কথা বলা, অপমানজনক আচরণ করা, চিকিৎসা না করানো, বৃদ্ধ বাবা-মাকে আলাদা রাখা, এমনকি শেষ সম্বল পেনশনের টাকা, জমি-জায়গা বাড়িটুকু পর্যন্তও জোর করে লিখে নেয়া হচ্ছে। অনেক বাবা-মা, সন্তান ও পুত্রবধূর কাছ থেকে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এমনকি মাদকাসক্ত ছেলে, মেয়ে, বাবা-মাকে হত্যা পর্যন্ত করছে।

অনেক সন্তান বৃদ্ধ বাবা-মাকে বাড়িতে তালাবদ্ধ করে রেখে নিয়মিত স্বামী-স্ত্রী তাদের কর্মস্থলে চলে যান। অনেক সময় অনেকে বৃদ্ধ বাবা-মাকে একাকী রুমে আটকে রেখে পাঁচ-ছয় দিনের জন্য বাইরে বেড়াতে চলে যায়। তাছাড়া পারিবারিক বা সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বা দাওয়াতে পরিবারের সব সদস্য অংশগ্রহণ করলেও বৃদ্ধ বাবা-মাকে ঝামেলা মনে করে সঙ্গে নিতে চায় না। অনেক প্রবীণদের থাকার জায়গাও নি¤œমানের হয়ে থাকে। যেমন বাড়ির নিচতলায়, বারান্দায়, চিলেকোঠায়, খুপড়িঘরে, গোয়ালঘরে এমনকি বাড়ির কাজের লোকের সঙ্গে অমানবিকভাবে থাকতে দেয়া হয়। অনেক সন্তান সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন অজুহাতে অসুস্থ বাবা-মায়ের এতটুকু খোঁজ-খবর পর্যন্ত নিতে চায় না। তাছাড়া অনেকে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দারিদ্র্যের কারণেও বাবা-মায়ের যতœ নিতে পারেন না। অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা-মা তাদের এই কষ্টের কথা কাউকে বলতেও পারেন না। এত কষ্টের পরেও কেউ ভালো-মন্দ জানতে চাইলে সন্তানের মুখ উজ্জ্বল করার জন্য বলেন, ‘আমি খুব ভালো আছি।’ যে প্রবীণ যৌবনে তার মেধা, মনন ও দক্ষতা দিয়ে সমাজের অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন, জীবনের সব সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের মানুষ করেছেন, মানবকল্যাণে অবদান রেখেছেন, বৃদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই মানুষটি অযতœ-অবহেলার আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। আপাতদৃষ্টিতে সমাজের বা সরকারের ন্যূনতম দায়িত্ব তাদের ওপর বর্তায় না। শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও সুন্দর জীবন গড়ার জন্য বাবা-মা ও সরকারের যেমন দায়িত্ব আছে, অনুরূপভাবে প্রবীণদের জন্য সন্তান, সমাজ ও সরকারের দায়িত্ব নেয়া উচিত।

প্রবীণদের এই দুর্দশা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এর সমাধান না করলে প্রত্যেককেই বৃদ্ধ বয়সে এই অবহেলা ও কষ্টের স্বাদ নিতে হবে। অনেক সন্তান তাদের কর্মব্যস্ততার কারণে কর্মস্থল ত্যাগ করে বাবা-মায়ের পরিচর্যা বা সেবা যতœ করতে পারে না। অনেক বাবা-মা নিজের ভিটামাটি ছেড়ে বিদেশে সন্তানের সঙ্গে থাকতে পছন্দ করে না। এসব নানা কারণে দিন দিন সন্তানদের সঙ্গে বাবা-মায়ের সুসম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া অনেক বাবা-মায়ের পুত্রসন্তান না থাকায় জামাই-মেয়ের বাড়িতে থাকতে পছন্দ করেন না। এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একটাই উপায় কষ্টের বৃদ্ধাশ্রম নয়, প্রত্যেক উপজেলায় আনন্দের সঙ্গে বসবাস করার জন্য ‘আনন্দ আশ্রয়’ গড়ে তুলতে হবে। যেখানে একই বয়সের অনেকেই থাকার কারণে প্রবীণরা বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে স্বেচ্ছায় থাকতে চাইবেন।

প্রত্যেক উপজেলা শহরের কাছাকাছি কমপক্ষে পাঁচ একর জমির ওপরে এই ‘আনন্দ আশ্রয়’ গড়ে তুলতে হবে। আনন্দ আশ্রয়ে থাকবে প্রবীণদের সুচিকিৎসার জন্য হাসপাতাল, থাকবে ভালো নার্সিং ব্যবস্থা, থাকবে ভালো মানের খাবার, বিনোদনের ব্যবস্থা, থাকবে প্রার্থনার জন্য মসজিদ, মন্দির, খেলার মাঠ, ব্যায়ামাগার প্রভৃতি। থাকবে ভালো আবাসনের ব্যবস্থা। এখানে যে কোনো প্রবীণ স্বেচ্ছায় থাকতে পারবেন। যাদের দেখার কেউ নেই, তাদের ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে বা একা থাকার ব্যবস্থা রাখতে হবে। ধনী প্রবীণরা ভাড়া বা খরচ দিয়ে থাকতে পারবেন। প্রয়োজন হলে তারা স্বেচ্ছায় কিছুদিন নিজের বাড়িতে, কিছুদিন ‘আনন্দ আশ্রয়ে’ থাকতে পারবেন। একই বয়সের অনেকে একসঙ্গে থাকার কারণে প্রবীণরা আনন্দে থাকবেন। এতে সন্তান ও আপনজনেরা দেশে-বিদেশে যেখানেই থাকুক না কেন বাবা-মা ভালো আছেন ভেবে তারাও নিশ্চিন্তে থাকতে পারবেন। প্রয়োজনে সন্তান ও আপনজন বিদেশ থেকে এসে কিছুদিন আনন্দ আশ্রয়ে বাবা-মাকে সঙ্গ দিতে পারবেন। গরিব অসহায় প্রবীণদের সরকারি খরচে থাকার ব্যবস্থা থাকবে।

অসহায় প্রবীণদের বিষয়টি জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে জনসচেতনতা ও প্রচারের মাধ্যমে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ‘আনন্দ আশ্রয়’ গড়ে তোলার জন্য নিজ দায়িত্বে সবাই এগিয়ে এলেই এ মহতী উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।এরই মধ্যে এই মহৎ উদ্যোগকে বেশিরভাগ সচেতন মানুষ ও ভুক্তভোগী প্রবীণ স্বাগত জানিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়কে বাস্তবায়নের জন্য সমাজে দানশীল ও বিত্তবানেরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে চায়। প্রবীণদের জন্য সামাজিক আন্দোলনে তরুণদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন, কারণ প্রবীণদের এই সমস্যার সমাধান না হলে একসময় ভুক্তভোগী হবে এখনকার তরুণ প্রজন্মই।

সাংবাদিক ও কলাম লেখক