বন্যার ক্ষতি প্রশমনে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা আমলে নিন

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বন্যা হতে পারে, পূর্বাভাস সে রকম পাওয়া যাচ্ছে। কাজেই আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে, সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর কিছু বলার থাকে না। ২০১৮ সালে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার নদীভাঙনের কথা আমাদের অনেকের মনে আছে। ওই সময় গণমাধ্যমে ‘৫১ বছরে পদ্মায় বিলীন ২৫৬ বর্গমাইল ভ‚মি’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনের উৎস ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (নাসা) আর্থ অবজারভেটরি প্রতিবেদন। নাসার প্রতিবেদনের তথ্য, পদ্মার ভাঙনে ১৯৬৭ সাল থেকে ৬৬ হাজার হেক্টরেরও (২৫৬ বর্গমাইল) বেশি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বড় শহরগুলোর একটি শিকাগোর প্রায় সমান।

ওই বছরের মার্চ-এপ্রিলে আমাদের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) বলেছে, পদ্মার যেখানে ভাঙন ধরে, সেখানে ১২ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত ভাঙতেই থাকে। নড়িয়া এলাকাটি ভাঙছে ১১ বছর ধরে। সংস্থাটি প্রতি বছর মার্চ-এপ্রিলের দিকে নদীভাঙনের পূর্বাভাস দেয়।

নাসার প্রতিবেদনে বলা হয়, লাখো মানুষ যাতায়াত, সেচ ও চাষাবাদের জন্য পদ্মার ওপর নির্ভরশীল। এ বিপুলসংখ্যক মানুষকে স্বভাবতই নদীটির ১৩০ কিলোমিটার উপক‚লের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে হয়।

নাসা যেসব কথা বলেছে, সেটি আমাদের অজানা নয়। আমাদের কোন নদীর গতিপথ কোন দিকে, কোন নদী দখল হচ্ছে, স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছেÑসবই আমাদের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর নখদর্পণে। তারা ঠিকমতো দায়িত্বপালন করলে নদীর ভাঙন তীব্র হতো না, কোটি কোটি মানুষ বারবার সর্বস্বান্ত হতো না; নদী রক্ষা কিংবা নদীশাসনে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হতো না।

আবহমান কাল থেকেই নদী বাংলাদেশের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। যাতায়াতের সুবিধা থাকায় গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতা গড়ে উঠেছে নদীতীরে। আমাদের প্রায় সব প্রধান শহর, নগর ও বাণিজ্যকেন্দ্র বিভিন্ন

নদীতীরে গড়ে উঠেছে। প্রবাহ, গতিবেগবিশিষ্ট নদী থেকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হচ্ছে। একসময় দেশে বিদ্যুতের বড় উৎস ছিল একমাত্র এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্র।

নদী কেবল আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেনি, সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও এটি উঠে এসেছে প্রবলভাবে। নদীকে ঘিরে রচিত হয়েছে কবিতা, গান, উপন্যাস ও চলচ্চিত্র। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বেও খ্যাতি অর্জন করেছে নদীবহুল অঞ্চলের লোকগীতি ভাটিয়ালি।

ভাঙনে বিস্তীর্ণ এলাকা বিলীন হওয়ার পরও দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিতে নদীর অবদান প্রশ্নবিদ্ধ নয়। এজন্য আমরাই আসলে দায়ী। নদীভাঙন সমস্যা এক দিনের নয়। নদীর অবৈধ দখল ও পরিবেশ দূষণ ঠেকাতে এবং ভাঙন রোধে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম জরুরি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পরিপালিত হলে ময়লা-বর্জ্য ফেলে কেউ নদী দূষিত করার দুঃসাহস পাবে না। বন্যার ক্ষতিও কমে আসবে।