খন্দকার আপন হোসাইন: প্রতি ১০০ বছরে একবার করে তাপমাত্রার পরিমাণ রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। এ তথ্যটি বিংশ শতাব্দী শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ধ্রুব সত্য বলে বিবেচিত হতো। কিন্তু বর্তমানে প্রায় প্রতি বছরই নতুন নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হচ্ছে। প্রাকৃতিক পরিস্থিতি প্রতিনিয়তই বিপর্যস্ত হচ্ছে। মানুষও বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। গোটা বিশ্বের সর্বত্র ঝড় থেকে বজ্রপাত পর্যন্ত প্রায় সব রকমের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যাও বাড়ছে বহুগুণে। প্রয়োজনের তাগিদেই জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি মানব মস্তিষ্কে অনুরণন সৃষ্টি করছে। এর প্রতিকারের ব্যবস্থা করা অতি জরুরি। এ জন্য প্রয়োজন সচেতনতা ও সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন। যে নীতিমালা অনুযায়ী কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সম্ভব।
বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সচেতন মানুষের মাঝে উপর্যুক্ত কথাগুলোই প্রধান আলোচ্য বিষয়। কারণ গত ১১ নভেম্বর থেকে আজারবাইজানের বাকুতে কপ-২৯ জলবায়ু সম্মেলন চলমান। এ সম্মেলন চলবে ২২ নভেম্বর পর্যন্ত। কপ-এর পূর্ণরূপ ‘কনফারেন্স অব পার্টিজ’। জাতিসংঘের ইউনাইটেড নেশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (ইউএনএফসিসিসি) বার্ষিক সম্মেলনই কপ হিসেবে পরিচিত। এ সংস্থার তালিকাভুক্ত দেশগুলোর পরিবেশবিষয়ক নীতিনির্ধারকদের নিয়ে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তবে বহু দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান অথবা পরিবেশবিষয়ক মন্ত্রী এ সম্মেলনে অংশ নেন। বিশ্বের পরিবেশ বিজ্ঞানী এবং জলবায়ু গবেষকরাও এ সম্মেলনে অংশ নিয়ে থাকেন। এবারের জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৯-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
অত্যধিক গরম, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, শক্তিশালী সামুদ্রিক ঝড়ের সৃষ্টি জলবায়ুর বিপৎসীমায় পৌঁছানোর ইঙ্গিত দেয়। পৃথিবী নামক গ্রহটি জলবায়ুর চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে ক্রমশ ধাবমান। চূড়ান্ত পর্যায় এমনই এক পর্যায় যেখানে পৌঁছলে ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব। চলমান কপ-২৯ সম্মেলন সেই গতি হ্রাসে কতটুকু ভূমিকা রাখবে? কার্যকর পদক্ষেপ কতটুকু দৃশ্যমান হবে? এই প্রশ্ন দুটির উত্তর জানতে বিশ্বজুড়ে পরিবেশবিদরা জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন-২০২৪-এর দিকে চেয়ে আছে। ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দেশ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ১.৫ ডিগ্রির নিচে নামাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিল।
আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত চলমান জলবায়ু সম্মেলন নিয়ে ওয়ার্ল্ড মেটিয়োরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসেছে প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা প্রবল বিপদের সম্মুখীন। প্রতিবেদনে ২০২৪ সালটিকে উষ্ণতম বছর হিসেবে উল্লেখ করেছে। এখন প্রশ্ন হলো পরিস্থিতি শোধরানোর দায়িত্ব কার? কে, কবে দায়িত্ব নেবে? বাকুতে চলমান ২৯তম জলবায়ু সম্মেলন আশার আলো ছড়াচ্ছে। প্রতি বছর আশার আলো ছড়িয়েই জলবায়ু সম্মেলন শুরু হয় কিন্তু শেষ পর্যন্ত হতাশ হতে হয়। মেলে না অনেক প্রশ্নের উত্তর। কপ-২৮ সম্মেলনেও জীবাশ্ম-জ্বালানির ব্যবহার থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তি উৎপাদন ক্ষমতাকে তিনগুণ বৃদ্ধি করতে সহমত প্রকাশ করেছিল। পাশাপাশি শক্তি কুশলতার হার দ্বিগুণ বৃদ্ধি করার কাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রেও ঐকমত্যে পৌঁছেছিল অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রতিনিধিরা। বাস্তবতা হলো, দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অর্থসাহায্যের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। এমনকি ক্ষমতাধর রাষ্ট্র আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উষ্ণায়নের অস্তিত্বকেই স্বীকার করতে চায় না। কপ-২৯ কতটুকু সার্থক হবে সে বিষয়ে হতাশা থেকেই যায়।
কপ-২৯ সম্মেলনকে ফাইন্যান্স সিওপি হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে জলবায়ুর আর্থিক অবদান সারিবদ্ধ করার একটি সুযোগ হতে পারে কপ-২৯। নতুন সমষ্টিগত কোয়ান্টিফায়েড গোলের (এনসিকিউজি) প্রায় প্রতিটি মৌলিক উপাদানসমূহে এখনও প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। এ সমস্যাগুলোর সৃজনশীল সমাধানের একটি ভিত্তি হতে পারে কপ-২৯। অভিযোজন বস্তুত প্রশমন দ্বারা ছেয়ে গেছে। কপ-২৯ হলো অভিযোজনকে অগ্রাধিকার দেয়ার এবং প্রয়োজনীয় সংস্থানগুলো সুরক্ষিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন অনিবার্য। শক্তিশালী অভিযোজন কৌশল অপরিহার্য। অভিযোজন কৌশলে আর্থিক ব্যবধান বন্ধ করা হবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। দাতা দেশগুলোকে অবশ্যই তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগসহ উদ্ভাবনী তহবিল ব্যবস্থার অনুসন্ধান জোরদার করা উচিত। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো জলবায়ু চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারবে।
ভবিষ্যতে পৃথিবীর অন্যতম সমস্যা হিসেবে যুদ্ধ বিগ্রহের কথা আসুক আর না আসুক জলবায়ুর পরিবর্তিত পরিস্থিতির কথা আসবেই। পৃথিবীতে মানুষ বসবাসের উপযোগী স্থলসমূহ পানির নিচে হারিয়ে যাওয়ার কথা আসবে। এ সমস্যা এখন শুধু অন্য দেশের সমস্যা নয় বরং বাংলাদেশের জন্যও অন্যতম সমস্যা। বাংলাদেশ এখনই জলবায়ুর পরিবর্তিত পরিস্থিতির বাস্তব ভুক্তভোগী হয়ে গেছে। সম্প্রতি আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের বিজ্ঞান ও জলবায়ুবিষয়ক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (সিএসই) সরকারি পরিসংখ্যান ও জনপরিসরে উপস্থিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিস্থিতিরও একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে এসেছে আসন্ন ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে আবহাওয়ার চূড়ান্ত বিচ্যুতির ফলে বাংলাদেশে মাত্রাতিরিক্ত খরা, বর্ষণ, শীত ও এলোমেলো গরম দেখা দেবে। ফলে ওই সময় বাংলাদেশে অন্তত এক হাজার জীবনহানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে আবহাওয়াজনিত বিপর্যয় যেমন ঘূর্ণিঝড়, অতিবর্ষণ, বন্যা, খরা, ভূমিক্ষয়, ধস প্রভৃতি রয়েছে। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ওই সময়ে ৯৩ শতাংশ দিনে অর্থাৎ মোট ২৭৪ দিনের মধ্যে ২৫৫ দিনেই আবহাওয়ার চূড়ান্ত বিচ্যুতি হয়ে বিপর্যয়মূলক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বিগত বছরগুলোয় অনুষ্ঠিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কপ সম্মেলন ছিল তৃতীয় কপ সম্মেলন বা থার্ড কনফারেন্স অব পার্টিজ। এটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল জাপানের কিওটো শহরে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যতীত প্রায় সকল দেশ সেখানে কিওটো প্রোটোকল চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যার প্রতিকারে শিল্পোন্নত দেশগুসমূহের করণীয় বিষয়ে দেশগুলো চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। কিওটো প্রটোকল চুক্তি কার্যকর হয় ২০০৫ সালে। এতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা নিয়ন্ত্রণে ভবিষ্যৎ রূপরেখা স্পষ্ট করা হয়েছিল। এজন্য অদ্যাবধি চুক্তিটির গুরুত্ব একটুও কমেনি। ৩য় কপ সম্মেলন পরবর্তী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনটি হলো কপ-২১। কপ-২১ সম্মেলন ২০১৫ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয়। এটি প্যারিস চুক্তি নামেও পরিচিত। ঐতিহাসিক এ চুক্তিতে বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নিয়ে আসার লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়। পরিবর্তনজনিত সমস্যা মোকাবিলার জন্য পৃথক তহবিল গড়ার বিষয়টি প্যারিস চুক্তিতেই প্রথম পরিষ্কারভাবে উঠে আসে। এতে বছরে ১০০ মার্কিন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়। এই অর্থ মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যবস্থা করার জন্য বিনিয়োগ করার কথা বলা হয়। ২০২১ সালে গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত কপ-২৬ সম্মেলনটিও বেশ প্রশংসিত। এখানে পরিবেশজনিত ক্ষতি কমাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করার কথা বলা হয়। এ সম্মেলনে বিশ্ব উষ্ণায়ন তথা তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখার সিদ্ধান্তকে পুনরায় মান্যতা দেয়া হয়। ২০৫০ সালের মধ্যে ক্ষতিকারক গ্যাস নির্গমন বন্ধ করার এবং বিশ্বব্যাপী কার্বন নিয়ন্ত্রণে প্যারিস চুক্তিতে গৃহীত বিষয়গুলো পুনরায় সুনির্দিষ্ট করা হয়।
বিশ্বজুড়ে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন এবং সমগ্র বিশ্বে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণবিষয়ক আলোচনাই সাধারণত কপ সম্মেলনে গুরুত্ব পায়। এছাড়া বিপদসংকুল দেশসমূহ পরিবেশ-সংক্রান্ত সমস্যার মোকাবিলা কীভাবে করবে, সে জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে—এসব ব্যাপারেও আলোচনা হয় কপ সম্মেলনে। আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত কপ-২৯-এ সব সমস্যার মোকাবিলা ও সমাধানে অর্থের ব্যবস্থা করার বিষয়টাই মূল প্রতিপাদ্য। আর এজন্যই বাকুর কপ বৈঠক ইতোমধ্যে ‘ফিন্যান্স কপ’ হিসেবে আখ্যা পেয়েছে বা চিহ্নিত হয়েছে। মানুষের বিবেচনাহীন আগ্রাসী কাজকর্মের কারণেই বিশ্বের তাপমাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অ্যান্টার্কটিকা বরফের ওপর কার্বন ডাইঅক্সাইডের ছাপ বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হারকে অতি দ্রুত বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পরিবর্তনশীল জলবায়ুর সার্বিক নিয়ন্ত্রণই হোক কপ-২৯-এর সাফল্য।




