তিনগুণ দামে দুই কোটি প্রি-পেইড মিটার দিতে চায় চীন

ইসমাইল আলী: সারা দেশে দুই কোটি গ্রাহকের জন্য স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে চীন। জিটুজি বা বাণিজ্যিক ঋণের ভিত্তিতে পাঁচ বছরে এ মিটারগুলো সরবরাহ করতে চায় দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত চায়না রেলওয়ে ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ। এগুলোর দাম ধরা হয়েছে প্রায় ৩৮৬ কোটি ডলার বা ৩১ হাজার কোটি টাকা। এতে প্রতিটি মিটারের দাম পড়বে ১৫ হাজার ৫০০ টাকা। যদিও এসব মিটার তিন হাজার ৩০০ থেকে পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা কিনছে বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানিগুলো।

যদিও এরই মধ্যে স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানিগুলো। এজন্য চীনের প্রস্তাব ফেরত দিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি)। আর ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি (ডেসকো), পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি), ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ও নর্দার্ন বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানি (নেসকো) প্রস্তাবটি আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রস্তাব দিয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, বাংলাদেশে স্মার্ট মিটারিং সিস্টেম (এএমআই) স্থাপনে গত ৭ জুন প্রস্তাব দেয় চায়না রেলওয়ে ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ। এতে দুই কোটি গ্রাহককে পাঁচ বছরে স্মার্ট মিটার সংযোগ প্রদানসহ স্মার্ট সিস্টেমের পরিপূর্ণ সমাধান (টোটাল সলিউশন) প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে কোম্পানিটি ব্যয় প্রাক্কলন প্রদান করেছে ৩৮৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার বা ৩০ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। এ অর্থ বাণিজ্যিক ঋণ বা জিটুজি ভিত্তিতে অর্থায়ন করা যেতে পারে বলে জানায় কোম্পানিটি। তবে দুই কোটি স্মার্ট মিটার স্থাপনে সংস্থাগুলোর নিজস্ব ব্যয়ে অবশিষ্ট ১৯৫ কোটি ডলার বা ১৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা সরবরাহ করতে হবে।

প্রস্তাবটি যাচাইয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের অধীন বিতরণ ছয় সংস্থা ও কোম্পানি এবং পাওয়ার সেলের মতামত চাওয়া হয়। এর মধ্যে পিডিবি ও ডিপিডিসি প্রস্তাব ফেরত দিয়ে জানায়, এরই মধ্যে গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পে তাদের আওতাধীন সংস্থা বা কোম্পানির জন্য প্রয়োজনীয় প্রি-পেইড বা স্মার্ট মিটারের সংস্থান রয়েছে। তবে ডেসকো, নেসকো, আরইবি, ওজোপাডিকো ও পাওয়ার সেল থেকে প্রস্তাবিত সিস্টেমটির কারিগরি ও আর্থিক বিষয়াবলি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন মর্মে মতামত ব্যক্ত করা হয়।

সূত্র জানায়, চীনের প্রস্তাবিত মিটারগুলোর দাম অনেক বেশি। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিতরণের জন্য ৩১ লাখ স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার কিনছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি)। এর মধ্যে ১-ফেজ মিটার রয়েছে ৩০ লাখ ৫০ হাজার। এগুলোর দাম পড়ছে গড়ে চার হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। একই ধরনের এক লাখ ৭৫ হাজার মিটার কিনছে ডিপিডিসি। এগুলোর প্রতিটির দাম পড়ছে তিন হাজার ৩০০ টাকা। আর এক লাখ ৮০ হাজার ১-ফেজ স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার কিনবে ডেসকো। এগুলোর প্রতিটির দাম পড়েছে পাঁচ হাজার টাকা। আর ওজোপাডিকো ও নেসকো এ ধরনের মিটার কিনছে পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা দরে।

যদিও চীনের প্রতিটি মিটারের দাম প্রস্তাব করা হয়েছে সাড়ে ১৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ তিন থেকে চারগুণ বেশি দামে এসব মিটার কিনতে হবে।

এদিকে চীনের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে জানানো হয়, চীনের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সব প্রতিষ্ঠানে একক ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। এজন্য অনলাইন সংযোগের প্রয়োজন হবে। ফলে প্রতিটি সংযোগের জন্য বর্তমান রেটে প্রতি মাসে সার্ভিস চার্জ ২৪ টাকা ৩৫ পয়সা হারে পরিশোধ করতে হবে। এজন্য আরইবির আওতাধীন গ্রামগুলোতে আপাতত এ ধরনের মিটার স্থাপন বন্ধ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।

বৈঠকে আরও বলা হয়, বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণ এলাকায় ১৫টি প্রকল্পের আওতায় ২৮ লাখ ৬৯ হাজার ৫৭৫টি মিটার কেনা ও স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। আরও চার প্রকল্পের আওতায় ৪০ লাখ প্রি-পেইড বা স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার কেনা ও স্থাপনের কার্যক্রম চলছে। এ অবস্থায় চায়না রেলওয়ে ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপের প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের যৌক্তিকতার বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।

জানতে চাইলে বৈঠকের সভাপতি ও বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব রহমত উল্লাহ মো. দস্তগীর বলেন, চায়না রেলওয়ে ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপের প্রস্তাবটি স্মার্ট মিটারিং সিস্টেমের প্রয়োজনীয়তা এবং এর কারিগরি ও আর্থিক বিষয়াবলি আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে বলা হয়েছে। এরপর প্রস্তাবটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।