বাংলা ভাষার ব্যবহার ও প্রকৃত বাস্তবতা

শাহ মুনতাসির হোসেন মিহান: একটি দেশের ভাষা সে দেশের স্বকীয়তা ফুটে তোলে। দেশের নিজস্বতার বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করে উক্ত দেশের ভাষার। দেশের সাধারণ মানুষ নিজেদের ভাব ভাষার মাধ্যমে বিনিময় করে। ঠিক সেভাবে ভাষার দরুন দ্বারা দেশের সংস্কৃতি, আবহ, কৃষ্টি বৈচিত্র্যময়তার মিশেলে বহন করে। এতে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ভাষার গুরুত্ব ও মাধুর্য সহজে প্রকাশ পায়। একটি দেশ তত বেশি বিকশিত। যত বেশি দেশটির ভাষা পরিশীলিত ও সহজে প্রকাশযোগ্য। ঠিক তেমনি আমাদের মাতৃভাষা বাংলাভাষা তেমনি ইতিবাচক ও সর্বমহলে গ্রহণীয়।

বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। আমাদের প্রাণের ভাষা। আমাদের মনের স্পন্দনে কানন সৃষ্টি করে বাংলা ভাষা। এই ভাষা বড্ড শ্রুতিমধুর ও রুচিসম্মত। আমরা আমাদের মনের ভাব আদান-প্রদান করে থাকি বাংলা ভাষার মাধ্যমে। যার ফলে মানুষের ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষাকে গণ্য করা হয়। দৈনন্দিন জীবনে আমরা আমাদের নিত্যদিনকার চলাফেরায় বাংলা ভাষার ওপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল। এই ভাষার সহজসরল ব্যবহার বাঙালিদের মধ্যে করে তুলেছে অনন্য। দিন দিন বাংলা ভাষার ব্যবহার বেড়ে যাচ্ছে। মাতৃভাষীর সংখ্যায় বাংলা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের পঞ্চম ও মোট ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনুসারে বাংলা বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা। এতে বাংলা ভাষার গঠনগত চর্চা ছড়িয়ে যাচ্ছে সবার মধ্যে। বাংলা ভাষা আমাদের প্রধানতম ভাষা ছাড়াও আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, মিজোরাম, ত্রিপুরা, জলপাইগুড়িসহ আরও কিছু রাজ্যতে এই ভাষার ব্যবহার বেশ লক্ষণীয়।

বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা হলেও এই ভাষা অর্জন করা বাঙালিদের জন্য সুখকর ছিল না। বরং বাংলা ভাষা অর্জনের পথ বাঙালিদের জন্য অমসৃণ ও কণ্টাকীর্ণ ছিল।

বাংলা ভাষা বিকাশের ইতিহাস ১৩০০ বছর পুরোনো। চর্যাপদ এ ভাষার আদি নিদর্শন। অষ্টম শতক থেকে বাংলায় রচিত সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডারের মধ্য দিয়ে অষ্টাদশ শতকের শেষে এসে বাংলা ভাষা তার বর্তমান রূপ পরিগ্রহণ করে। বাংলা ভাষার লিপি হলো বাংলা লিপি। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরে জন্ম হয় ভারত ও পাকিস্তান নামে নতুন দুটি দেশ। পাকিস্তান অংশের দুটি অংশ ছিল। একটি হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তান, অপরটি হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তান। পশ্চিম পাকিস্তান অঞ্চলের প্রধান ভাষা ছিল উর্দু ভাষা। আর পূর্ব পাকিস্তানের ভাষাভাষীর মধ্যে বেশি মানুষ ছিল বাংলা ভাষার ব্যবহার। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান কখনোই তা মেনে নিতে চাই না। তারা সবসময় উর্দুকে পূর্ব  পাকিস্তানের প্রধান ও দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আসছিল।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের কয়েক মাসের মধ্যেই পাকিস্তানের প্রথম মুদ্রা, ডাকটিকিট, ট্রেনের টিকিট, পোস্টকার্ড ইত্যাদি থেকে বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দু ও ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়। পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশনের এই ঘোষণায় পর ঢাকায় ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীদের বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাংলাভাষীরা উর্দুভাষীদের চেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। তারপরও ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান সফরে এসে রেসকোর্স ময়দানে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এক সমাবেশে স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন যে ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা’; যা এক প্রকার বিতর্ক ও সমালোচনা সৃষ্টি করে পূর্ব পাকিস্তানে। যার ফলে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ জনগণ কখনোই পশ্চিম পাকিস্তানের এই কথা মেনে নেয়নি। উপরন্তু প্রতিবাদ ও আন্দোলনে মুখর থাকে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ জনগণ।

সেই আন্দোলন ও প্রতিবাদের ফসল হচ্ছে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে সালাম, রফিক, শফিক, জব্বার প্রমুখদের তাজা রক্তে ইতিহাস রচিত হয় এই ভূখণ্ডে। তাদের প্রাণের বিনিময়ে আমরা অর্জন করি আমাদের মায়ের ভাষার স্বীকৃতি। যে স্বীকৃতির বলীয়ানে বাঙালিরা খুঁজে পায় আলোর দিশা। পশ্চিম পাকিস্তানিরা জোরপূর্বক অন্যায়ভাবে ছাপিয়ে দিতে চেয়েছিল উর্দু ভাষাকে। কিন্তু সালাম, রফিক, শফিক, জব্বারদের ত্যাগ-তিতিক্ষা সংগ্রামে তা হয়নি এই বদ্বীপে। ঐতিহাসিকভাবে এই ইতিহাস, আন্দোলন প্রতিটি বাঙালির নিকট স্মৃতিতে অমলিন ও চির ভাস্বর হয়ে আছে। তাদের অকুণ্ঠ অবদান বাঙালি জাতির ইতিহাসকে করেছে গৌরবোজ্জ্বল। কিন্তু যে ভাষার জন্য আমাদের দেশের মানুষের এত আত্মত্যাগ, নিবেদন, শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে মাতৃভাষা। সে ভাষার ব্যবহার ও বিকাশ  প্রকৃতপক্ষে সেভাবে হচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে অফিস, আদালত, আমলাতান্ত্রিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সকল প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষার ব্যবহার সেরূপ হচ্ছে না। তাছাড়া আমরা পাশ্চাত্যের মোহে বিবর্জিত হওয়ার ফলে ইংরেজি ভাষার প্রতি বিশেষভাবে আকর্ষিত হচ্ছে। ইংরেজি ভাষাকে অধিক প্রাধান্য দিচ্ছি বাংলা ভাষার তুলনায়; যা বাংলা ভাষাকে হুমকির মুখে ফেলছে। তা ভাষার দূষণ ও অনুপযুক্ত ব্যবহার দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে; যা বাংলা ভাষার শতভাগ বিকাশে অন্তরায়। তাছাড়া বাংলা ভাষার নিয়মকানুন ও অনুশীলনের প্রতি আমরা পূর্ণাঙ্গভাবে যত্নশীল নই। এতে বাংলা ভাষার দূষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তদুপরি ব্যাপকতা হ্রাস পাচ্ছে।

বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃত একটি ভাষা। কারণ পৃথিবীর কোনো দেশ নিজের ভাষার জন্য প্রাণ দেয়নি। সেখানে বাংলা ভাষার জন্য কত মানুষ প্রাণ দিয়েছে তার সঠিক তথ্য আজও অজানা। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ঐক্যবদ্ধতার বীজ বপন হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের দ্বারা। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে এই দিনটিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালন করা হতো। কিন্তু ২০০০ সাল থেকে একযোগে পুরো বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

বাংলা ভাষার ব্যবহার ও অনুশীলন এবং বিকাশ ঘটা অত্যন্ত জরুরি। সে জন্য উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বাংলা ভাষাকে বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বাংলা ভাষার নিয়মকানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। বাংলা ভাষার প্রকৃত নিয়মকানুন জানতে হবে। প্রাক-প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত বাংলা ভাষাকে অনুশীলন ও চর্চার আওতায় রাখতে হবে। বাংলা ভাষাবিষয়ক গবেষণাকর্ম বৃদ্ধি করতে হবে। বাংলা ভাষা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মাঝে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা বাংলা ভাষা জানার ও শিখার প্রতি আরও আগ্রহী হবে। শুধুমাত্র ফেব্রুয়ারি মাসকেন্দ্রিক আয়োজন না করে বছরব্যাপী বাংলা ভাষার আয়োজনমূলক চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। বাংলা ভাষাকে উচ্চশিক্ষার স্তরে বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে দিতে হবে। এতে বাংলা ভাষার লাল-সবুজের আবহমান গুরুত্ব ও কদর আরও গতিশীল হবে বিশ্বপরিমণ্ডলে।

শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়