বিশেষ প্রতিনিধি: বিদ্যমান গ্রাহকদের দর অপরিবর্তিত রেখে গত ৬ জানুয়ারি নতুন শিল্প কারখানার বয়লার ও শিল্প কারখানার জেনারেটরে (ক্যাপটিভ) সরবরাহ গ্যাসের দাম যথাক্রমে ৩০ ও ৩১ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৭৫ টাকা ৭২ পয়সা করার প্রস্তাব দেয় পেট্রোবাংলা। এতে শিল্প খাতে গ্যাসের দাম ১৫২ দশমিক ৪০ শতাংশ ও ক্যাপটিভে ১৩৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়। এ প্রস্তাবের ওপর আজ শুনানি করবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। রাজধানীর বিয়াম অডিটোরিয়ামে ওই শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
মূলত আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ভর্তুকি কমিয়ে দামের বোঝা শিল্প খাতের উদ্যোক্তাদের ওপর চাপানোর জন্য এ শুনানি আয়োজন করা হয়েছে। যদিও এর মাধ্যমে দেশে নতুন শিল্প স্থাপন ও বিনিয়োগ অনুৎসাহিত হবে বলে দাম বৃদ্ধির উদ্যোগ বাতিলে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বারবার দাবি জানিয়ে আসছিল। এছাড়া ভোক্তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এ শুনানি বাতিলের দাবি জানিয়েছে। তবে কোনো দাবিই বিবেচনা করেনি অন্তর্বর্তী সরকার।
সূত্রমতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিলেট গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেড থেকে ১ টাকা দরে, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি থেকে ১.২৫ টাকা দরে, বাপেক্স থেকে ৪ টাকা দরে প্রতি ঘনফুট গ্যাস কেনা হয়। এর সঙ্গে বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন বাংলাদেশ ও তাল্লোর কাছ থেকে কেনা গ্যাসের সংমিশ্রণে গড় দর দাঁড়ায় ৬.০৭ টাকা ঘনমিটার। যদিও প্রতি ঘনমিটার এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয় পড়ে গড়ে ৬৫ টাকা ৭০ পয়সা।
পেট্রোবাংলা দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে বলেছে, প্রতি ঘনমিটার এলএনজির বর্তমান আমদানি মূল্য পড়ছে ৬৫.৭০ টাকা। ভ্যাট-ট্যাক্স ও অন্যান্য চার্জ যোগ করলে দাঁড়ায় ৭৫.৭২ টাকা। ফলে এ খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে গ্যাসের প্রাইস গ্যাপ কমাতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এলএনজি আমদানি করলে চলতি অর্থবছরে পেট্রোবাংলার ঘাটতি হবে প্রায় ১৬ হাজার ১৬১ কোটি ৭১ লাখ টাকা। প্রাইস গ্যাপ কমাতে হলে দাম বাড়ানো দরকার।
পেট্রোবাংলার দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, দেশীয় গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাওয়ায় শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে। সরবরাহকৃত গ্যাসের মধ্যে দেশীয় গ্যাসফিল্ডগুলো থেকে পাওয়া যাচ্ছে ৭৫ শতাংশের মতো, অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ এলএনজি আমদানি করে করা হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন হ্রাস পেতে পারে এবং এলএনজি আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। ২০৩০-৩১ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ দাঁড়াবে ৭৫ শতাংশে। পেট্রোবাংলার প্রস্তাব পাওয়ার পর বিইআরসির পক্ষ থেকে বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব চেয়ে চিঠি দেয়া হয়। বিতরণ কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ‘পেট্রোবাংলা আমাদের কাঁধে বন্দুক রেখে দাম বাড়াতে চাইছে। গণশুনানিতে ভোক্তাদের মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। অথচ আমরা এই দাম বাড়ানোর সঙ্গে মোটেই একমত নই। আমরা যতটুকু জেনেছি মন্ত্রণালয়ের চাওয়ার অনুযায়ী নতুন দর ফর্মুলা প্রস্তুত করা হয়েছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিতে হয়েছে।’
যদিও পেট্রোবাংলা গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করে দেয় বিইআরসি। তবে গ্যাসের এই দাম বৃদ্ধির প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যবসায়ী নেতা ও সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তারা অবিলম্বে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন। ওই প্রস্তাব অনুমোদন হলে শিল্পায়ন বন্ধ হয়ে যাবে বলে মনে করছেন তারা। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) প্রেসিডেন্ট হাতেম আলী গণমাধ্যমকে বলেছেন, এই প্রস্তাব পাস হলে শিল্পায়ন থমকে যাবে। একটি অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে। নতুন করে বিনিয়োগ আসবে না। কেউ ৩০ টাকা দিয়ে গ্যাস কিনবে আবার কেউ ৭৫ টাকা দেবে, যারা বেশি দামে কিনবে তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। কারণ বাজার তো একটাই।
তথ্যমতে, শিল্প ও ক্যাপটিভ খাতে প্রতিশ্রুত গ্রাহকদের (ইতোমধ্যে অনুমোদিত) গ্যাসের বিলও ৭৫.৭২ টাকা নির্ধারণ চায় পেট্রোবাংলা। অন্যদিকে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ও কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির প্রস্তাবে মিটারবিহীন আবাসিক গ্রাহকদের বিল বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। সব মিটারবিহীন গ্রাহকের আঙিনায় প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের পূর্ব পর্যন্ত এক চুলা ৭৩ দশমিক ৪১ ঘনমিটার ও দুই চুলা ৭৭ দশমিক ৪১ ঘনমিটার বিলের কথা বলা হয়েছে। ২০২২ সালের মে মাসে তা নির্ধারণ করা হয় যথাক্রমে ৫৫ ও ৬০ ঘনমিটার।
বর্তমানে একমুখো চুলার বিল ৯৯০ টাকা ও দ্বিমুখী চুলার বিল এক হাজার ৮০ টাকা। তবে নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে একমুখো চুলার বিল হবে এক হাজার ৩২০ টাকা ও দুইমুখো চুলার বিল এক হাজার ৩৯০ টাকা। তবে ২০২৩ সালের শুরুতে গ্যাসের ব্যবহার তিতাস গ্যাস এক চুলায় ৭৬ দশমিক ৬৫ ঘনমিটার এবং দুইমুখো চুলায় ৮৮ দশমিক ৪৪ ঘনমিটার করার আবেদন দিয়েছিল। এতে একমুখো চুলার বিল দাঁড়াবে ১ হাজার ৩৮০ টাকা ও দুইমুখো চুলার বিল এক হাজার ৫৯২ টাকা।
যদিও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির শুনানি বাতিলের দাবি ক্যাব লিখিত আবেদন করেছিল। সেই প্রস্তাবে বিইআরসি সাড়া না দেয়ার প্রতিবাদে ক্যাব আজ বিয়াম মিলনায়তনের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এর আগে গত শনিবার সংবাদ সম্মেলনে ক্যাবের নেতারা বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ানোর এ উদ্যোগ জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেছিলেন, বৈষম্যের বিরুদ্ধেই আন্দোলন হয়েছে, রক্তদান হয়েছে, রক্তের দাগ এখনও শুকায়নি। এমন অবস্থায় গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির বৈষম্যমূলক প্রস্তাব অনুমোদন করে জ্বালানি বিভাগ বিস্মিত করেছে। তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের সরকারের আচরণ যদি আগের সরকারের মতো হয় তাহলে আন্দোলন শুরুতেই ব্যর্থ মনে হবে। ৬ মাসে সরকারের দাম বাড়ানো, রপ্তানি শিল্পকে অস্থির করে তোলাটা অশনিসংকেত মনে হয়। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করা দরকার, এটা ক্যাব বিশ্বাস করে না। নেপথ্যের কোনো শক্তি এটা করাচ্ছে।




