এসএম রুবেল, কক্সবাজার : মহেশখালীর বিখ্যাত মিষ্টি পান শুধু দেশের ভেতরে নয়, বিদেশেও বেশ চাহিদাসম্পন্ন। এই পান চাষে জড়িত আছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার পরিবার। তবে প্রতিবছরের মতো এবারও বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে চাষিদের মাঝে দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, এই অঞ্চলে পানচাষ হয় মূলত পাহাড়ের ঢাল ও নিচু জমিতে। বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টির দরুন পাহাড় থেকে নেমে আসে ঢল। এতে জমিতে পানি জমে যায়, বরজ ভেঙে পড়ে, গাছ পচে যায় এবং ছত্রাক ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বেড়ে যায়। পানি বের হওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় পুরো বরজ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে। কখনও পাহাড় ধসেও বড় ক্ষতি হয়।
তথ্য বলছে, মহেশখালীতে বর্তমানে প্রায় এক হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে প্রায় ৯ হাজার পানের বরজ রয়েছে। এ খাতে প্রায় ১৩ হাজার চাষি সরাসরি যুক্ত। প্রতি একরে গড়ে বছরে ২৭ টন পান উৎপাদিত হয়। মহেশখালীর মিষ্টি পান দেশের বাজার ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের নানা দেশে রপ্তানি হচ্ছে। তবে রপ্তানির চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত পান রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে ১৪ দশমিক ০৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের বছরের একই সময়ে (২০২২-২৩) আয় হয়েছিল ২৩ দশমিক ৯৮ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ৪১ শতাংশ।
চাষিদের দাবি, বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই বরজ রক্ষায় প্রশিক্ষণ, পানি নিষ্কাশনের উন্নয়ন, আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জরুরি তহবিল গঠন এবং বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগ নেয়া দরকার।
স্থানীয় চাষি নুরুল আমিন বলেন, গত বছর টানা বৃষ্টিতে অর্ধেক বরজ নষ্ট হয়ে গেছে। এবারও যদি আগেই ব্যবস্থা না নিই, তাহলে একই ক্ষতি হবে। চাষি সেলিম উদ্দিন বলেন, আগে বড় পান ৩০০-৪০০ টাকায় প্রতি বিড়া বিক্রি করতাম। এখন ১৫০ টাকার বেশি কেউ দিতে চায় না। মাঝারি পানের দাম ৫০-৬০ টাকা। এতে খরচই উঠছে না।
ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা আসার আগে কৃষি অফিস থেকে কোনো ধরনের পূর্বসতর্কতা, প্রশিক্ষণ বা সহায়তা দেয়া হয় না। ক্ষতির পরে কেউ এলেও তারা ক্ষতিপূরণ পান না।
চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বরজ তৈরিতে এখন আগের চেয়ে বেশি খরচ হচ্ছে। বাঁশ, ছন, মজুরি ও ওষুধের দাম বেড়ে গেছে। একেকটি বরজে খরচ হচ্ছে দুই থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত। বেশিরভাগ চাষি ধার-দেনা করে বরজ তৈরি করেন।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আনোয়ার হোসেন বলেন, আমরা বরজ পর্যবেক্ষণ করছি। কৃষকদের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা চালু রাখার ব্যবস্থা এবং কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি। তবে বড় পরিসরে সহায়তা দরকার হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব।
স্থানীয়রা বলছেন, পান শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়, এটি মহেশখালীর সংস্কৃতি ও জীবিকার অংশ। প্রতিবছর বর্ষার ক্ষতি বন্ধ না হলে কৃষকরা যেমন বিপদে পড়বেন, তেমনি দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী কৃষিপণ্য হারিয়ে যেতে পারে।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, কক্সবাজারে ৫ জুন পর্যন্ত ৪৫০-৫৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হতে পারে। এই সময়েই পান বরজে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা আছে।




