মো. রাইসউদ্দিন, বর্ণমালা আর্কিটেক্ট অ্যান্ড ইন্টেরিয়রের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। ইন্টেরিয়র ডিজাইন ব্যবসায় এক দশকের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এই তরুণ উদ্যোক্তা ইতোমধ্যে তাঁর ক্লায়েন্ট তালিকায় যুক্ত করে নিয়েছেন দেশের অর্ধ শতাধিক বৃহৎ প্রতিষ্ঠানকে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি তুলে ধরেছেন ইন্টেরিয়ার ডিজাইন (অভ্যন্তরীণ নকশা) ব্যবসার ব্যাপক সম্ভাবনার নানা দিক। কথা বলেছেন নূরউদ্দিন রানা
শেয়ার বিজ: অভিনন্দন আপনাকে। চাকরিপ্রার্থী না হয়ে হয়েছেন উদ্যোক্তা ও চাকরিদাতা। কীভাবে জড়ালেন ব্যবসায়?
মো. রাইসউদ্দিন: ভালো-মন্দ এবং সম্ভাবনা ও সংকটের দোলাচলে চলছে আমার উদ্যোক্তা-জীবন। আমার পিতা ছিলেন আবাসন খাতের ব্যবসায়ী এবং ২০০৯ সালে তিনি গড়ে তুলেছেন বর্ণমালা হোমস লিমিটেড। ২০১৮ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। পারিবারিক ব্যবসার উত্তরাধিকার হয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তুলেছি বর্ণমালা আর্কিটেক্টস অ্যান্ড ইন্টেরিয়র। এছাড়া গড়ে তুলেছি বর্ণমালা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, বর্ণমালা মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশনস এবং বর্ণমালা ট্রেড।
শেয়ার বিজ: ব্যবসা জীবনের শুরু থেকে আপনি বিচরণ করছেন বিকাশোš§ুখ ও সম্ভাবনাময় ইন্টেরিয়ার ডিজাইনিংয়ের জগতে। কীভাবে জড়ালেন এই খাতে?
রাইসউদ্দিন: বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকাল থেকেই পিতার সান্নিধ্যে ব্যবসায় সম্পৃক্ত হয়েছি। চাকরি প্রার্থী হওয়ার ভাবনা আমাকে আচ্ছন্ন করেনি কখনও। পারিবারিক ব্যবসায় সম্পৃক্ত হলেও আমি আমার নিজের পছন্দের ক্ষেত্রটি বেছে নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম। সে কারণে আবাসন শিল্পের অনুগামী সেবা খাত ইন্টেরিয়র ডিজাইনিংয়ের ক্ষেত্রটিকে বেছে নিয়েছি। যতই দিন যাচ্ছে এ খাতের এগিয়ে যাওয়ার পথের বহুবিধ বাধা-প্রতিবন্ধকতা, যা বিকাশের পথ আগলে রেখেছে।
শেয়ার বিজ : ইন্টেরিয়র ডিজাইন বলতে আসলে কী বোঝায়?
রাইসউদ্দিন : ইন্টেরিয়র ডিজাইন হলো এমন একটি শিল্পিত প্রক্রিয়া, যা যে কোনো স্থান, তা হোক বাড়ি কিংবা অফিস, হাসপাতাল কিংবা রেস্টুরেন্ট কিংবা রিসোর্ট, যাই হোক না কেন; সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা দানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একটি সেবা খাত। ইন্টেরিয়র ডিজাইন আসবাবপত্র, রঙ ও আলোর বিন্যাস এবং স্থানের ব্যবহারে লাগসই ও কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করে। এটি স্থানের সৌন্দর্য এবং কার্যকারিতা দুটোই বাড়াতে সাহায্য করে। এটি শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং একটি জায়গার কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য অপরিহার্য। আধুনিক জীবনে ইন্টেরিয়র ডিজাইন এখন বিলাসিতা নয়, বরং জীবনের মান উন্নত করার একটি অত্যাবশ্যক সেবা খাত।
শেয়ার বিজ: ইন্টেরিয়র ডিজাইনিংয়ের চাহিদা ক্রমে বাড়ছে। এ খাতের গুরুত্ব কতটা?
রাইসউদ্দিন: ছোট্ট ভূখণ্ডে বিশাল জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশ। সে কারণে ইন্টেরিয়র ডিজাইন আবাসন শিল্পের অনুগামী সেবা খাত হিসেবে ব্যাপক সম্ভাবনার বার্তা দিয়েছে আমাকে। ইন্টেরিয়র ডিজাইন এমন একটি শিল্প, যা একটি বাড়ি/অফিস কিংবা যে কোনো স্থানের কার্যকরী, আরামদায়ক এবং নান্দনিক করে তোলে। সেই সঙ্গে বাড়িয়ে তোলে উৎপাদনশীলতা।
শেয়ার বিজ: এ খাতের চাহিদা বাড়ার কারণ কী? এর বৈশ্বিক বাজার কতটা বড়?
রাইসউদ্দিন: নগরায়ণ, ক্রমবর্ধমান আয় এবং ক্রমবর্ধমান রিয়েল এস্টেট খাতের কারণে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ নকশার বাজার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে এর বৈশ্বিক বাজার ২০০ বিলিয়ন ডলারও অধিক এবং আগামী পাঁচ বছরে এটি দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। স্টাইলিশ এবং কার্যকরী জীবনযাত্রা এবং কর্মক্ষেত্রের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, সেইসঙ্গে নানন্দিক আবাসনের ধারণা এবং বাণিজ্যিক স্থানের লাগসই, আরামদায়ক ও কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে অবদানের কারণে এ খাতের বাজার বাড়ছে।
শেয়ার বিজ: বাংলাদেশে ইন্টেরিয়র ডিজাইন খাতের শুরু কবে এবং বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানাবেন।
রাইসউদ্দিন: আবাসন শিল্পের অনুগামী সেবা খাত হিসেবে ইন্টেরিয়র ডিজাইন ব্যবসার শুরু এ দেশে। তবে প্রথমে চাহিদা কম থাকলে মানুষের আয় বৃদ্ধি, জীবনের মানোন্নয়ন ও রুচিবোধের কারণে বিগত দু’দশক ধরে এ খাতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি ঘটছে। বলতে পারেন, নতুন শতাব্দীর শুরু থেকে এ দেশে এটি ডানা মেলতে শুরু করেছে এবং সম্ভাবনাময় নতুন ব্যবসার খাত হিসেবে উজ্জ্বল সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত আমরা স্থানীয় ক্লায়েন্টদের চাহিদা পূরণ করছি। তবে কেউ কেউ সীমিত পরিসরে বৈশ্বিক ক্লায়েন্টদের কিছু প্রজেক্ট সম্পন্ন করে যাচ্ছেন। তবে বৈশ্বিক ২০০ বিলিয়ন ডলারের বাজারে বাংলাদেশ এখনও এন্ট্রি নিতে সক্ষম হয়নি।
শেয়ার বিজ: সম্ভাবনাময় হলেও বাংলাদেশ ইন্টেরিয়র ডিজাইন খাতে কেন পিছিয়ে?
রাইসউদ্দিন: গত কয়েক দশক ধরে দেশে ইন্টেরিয়র ডিজাইন ব্যবসা শুরু হলেও এ খাতের এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হলো নীতিমালার সংকট, সেই সঙ্গে তৈরি হয়ে উঠেনি দক্ষ জনবল, নেই পেশাগত মর্যাদার স্বীকৃতি। সর্বোপরি, উপকরণের আমদানি-নির্ভরতা এ খাতে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার কারণ। অতি সম্প্রতি ‘ইন্টেরিয়র ডিজাইনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (আইডিএবি)-এর নেতৃত্বে একটি নীতিমালা তৈরি ও স্বীকৃতি পেয়েছে বলে জানি। সংগঠনটি পেশাগত স্বীকৃতির বিষয়েও কাজ করছে বলে জানি। ইন্টেরিয়র ডিজাইনে জনবল তৈরিতে নিবেদিত প্রথম ও একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় শান্তা মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি। এছাড়া বেশ কিছু ইনস্টিটিউট ইন্টেরিয়র ডিজাইনে জনবল তৈরিতে চালু থাকলেও তাদের পাঠ্যসূচি যুগোপযোগী নয়। ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থাও নেই। ফলে চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছে না। মূলত এটি এ খাতের বিকাশের প্রধান অন্তরায়।
শেয়ার বিজ: আপনার বর্ণমালা আর্কিটেক্টস অ্যান্ড ইন্টেরিয়রের অর্জন ও সাফল্য কী?
রাইসউদ্দিন: প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বর্ণমালা আর্কিটেক্টস অ্যান্ড ইন্টেরিয়র এ পর্যন্ত অর্ধ শতাধিক বৃহৎ প্রতিষ্ঠানকে ক্লায়েন্ট তালিকায় যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে এবং তারা আমাদের ব্র্যান্ডিংয়ে ভূমিকা রাখছেন। বর্ণমালার ক্লায়েন্ট তালিকায় আছে বাংলাদেশ সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয় ও সংস্থা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বৃহৎ শিল্পগ্রুপ, আবাসন কোম্পানি, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান, এনজিও, প্যান প্যাসিফিক হোটেল সোনারগাঁও। ভিন্ন ধারার কাজের মধ্যে আছে আস্ সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের মেগা কিচেন প্রকল্প। হোম ও অফিসের ইন্টেরিয়র ডিজাইনের বাইরে আমরা উদ্ভাবনী ধারণায় নতুন নতুন ক্ষেত্রগুলোতে বিচরণের অধিক আগ্রহী। এ খাতে বর্ণমালা আর্কিটেক্টস ও ইন্টেরিয়র অধিকতর অবদান রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
শেয়ার বিজ: আপনাদের সাফল্য কামনা করছি। মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।
রাইসউদ্দিন: আপনাকেও ধন্যবাদ।