সুচিস্মিতা চক্রবর্তী : প্রাকৃতিক গ্যাস বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতিনিয়ত ব্যবহারযোগ্য উপাদানের একটি। তবে বাসাবাড়ি ও শিল্পকলকারখানাগুলো প্রায়ই প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট মুখোমুখি হয়। গ্যাস সংকট কোনো এক দিনের ঘটনা নয়, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, যা বর্তমান সময়ে আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। এই সংকট শুধু গৃহস্থালি জীবনকে প্রভাবিত করছে না, বরং দেশের অর্থনীতিকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশে দৈনিক গ্যাস চাহিদা ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন কিউবিক ফুট (এমএমসিএফডি) ছাড়িয়ে গেলেও সরবরাহ মাত্র ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ এমএমসিএফডি। এই ঘাটতির ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বাংলাদেশের গ্যাস সংকটের পেছনে কয়েকটি অন্যতম কারণ থাকলেও দেশীয় গ্যাস উৎপাদন স্থির থেকে কমছে। ২০২৪-২৫ সালে উৎপাদন ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ এমএমসিএফডি স্তরে আটকে আছে, যেখানে চাহিদা ৩ হাজার ৫০০ এমএমসিএফডি ছাড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর অত্যধিক নির্ভরতা রয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হয়েছে, যা ২০২২ সাল নাগাদ গ্যাস চাহিদার ২২ শতাংশ পূরণ করছে, কিন্তু গ্লোবাল মার্কেটে দাম বৃদ্ধি (২০২৩ সালে ২৭-৩৬ ডলার/এমএমবিটিইউ) এবং সরবরাহের অনিয়মিততা সংকটকে বাড়িয়েছে। এখানেই শেষ নয়, ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটের (এফএসআরইউ) অপারেশন বন্ধ হওয়া অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দুটি এফএসআরইউর একটি মেইনটেন্যান্সের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে চট্টগ্রামে সম্পূর্ণ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়। এছাড়া সরকারি সিদ্ধান্তের বিলম্ব, নতুন অনুসন্ধানের অভাব এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা সংকটকে আরও গভীর করেছে। এরই সঙ্গে সঙ্গে পাইপলাইন লিক এবং পানি প্রবেশের মতো প্রযুক্তিগত সমস্যাও যুক্ত হয়েছে। তবে কারণ যাই হোক না কেন গ্যাস সংকটের সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। শহরাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় রান্নার কাজ ব্যাহত হচ্ছে, অনেক পরিবার এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু হতাশার বিষয় হলো এলপিজি সংকটও বর্তমানে তীব্র। ১২ কেজি সিলিন্ডারের অফিশিয়াল দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা হলেও বাজারে ২ হাজার ৫০০ টাকায় পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এতে একটি পরিবারের বার্ষিক অতিরিক্ত খরচ ১০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। গ্যাস সংকটের কারণে চার মিলিয়নের বেশি পরিবার এখন এলপিজির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যার ফলে সামগ্রিকভাবে বার্ষিক খরচ বেড়ে এক মিলিয়ন টন ছাড়িয়েছে। বিদ্যুৎ ছাড়া এয়ার কন্ডিশনার চালানো যাচ্ছে না, যা গরমের সময় হিট স্ট্রেস বাড়াবে। আরো দুঃখের বিষয় নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের খরচ কমিয়ে এনার্জি খরচ মেটাচ্ছে, যা তাদের জীবনমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ঢাকার মতো এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় লোকেরা বৈদ্যুতিক চুলা কিনছেন, যার দামও বেড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে গ্রীষ্মের মৌসুমে দেশ ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটে পড়বে, যা কখনোই কাম্য নয়। এখানেই শেষ নয়, সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বিস্তৃত। শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ২৫-৫০ শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে এর ক্ষতিকর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল সেক্টরে। গত তিন মাসে টেক্সটাইল শিল্পে ১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারের উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে, যা এক্সপোর্টকে প্রভাবিত করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে ৯ হাজার ৫২০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে, যেখানে ক্যাপাসিটি ২৬ হাজার ৫০৪ মেগাওয়াট। এখনো প্রকৃতিতে শীতের আমেজ রয়ে গেছে, তাই এখনো অনেকেই এই অবস্থার ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারছে না। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে সামনে খুবই ভয়াবহ দিন আসতে চলেছে। তাছাড়া দেশের জিডিপি গ্রোথ ২০ বছরের সর্বনিম্নে পৌঁছেছে, কারখানা বন্ধ এবং চাকরি হারানোর ঝুঁকি বেড়েছে। পরিবহন সেক্টরে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি যানবাহন প্রভাবিত, সিএনজি স্টেশন বন্ধ হয়েছে। সাবসিডি বেড়ে ২৯৭ বিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে, যা অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি কৃষি ও এসএমই সেক্টরও ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মন্থর করছে। এই অবস্থা বিবেচনায় এখনই পদক্ষেপ না নিলে সামনের দিন ভয়াবহ হতে চলেছে। তাই নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, রিনিউয়েবল এনার্জিতে বিনিয়োগ এবং এলএনজি আমদানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা দরকার। যদিও সরকার এলপিজি আমদানির নিয়ম শিথিল করেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া সংকট চলতে থাকবে। গ্যাস সংকট বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে একটি বড় বাধা। এটি শুধু গৃহস্থালি জীবনযাপনকে কষ্টকর করে দিচ্ছে না, অর্থনীতিকে দুর্বল করছে। সঠিক নীতি এবং দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এর প্রভাব আরও গভীর হবে, যা কখনোই কাম্য নয়। বরং সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে গ্যাস সংকটের সমাধান করলে দেশের মানুষের জীবনমান উন্নত হবে এবং দেশের অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।
শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post