মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ইসলাম : দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেটি একসঙ্গে উন্নয়ন ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্ন, বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, নীতিগত বিপর্যয় এবং জলবায়ু ঝুঁকি-এসব বহুমাত্রিক বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন আবেগ বা সেøাগানের বাইরে গিয়ে তথ্য ও সক্ষমতার আলোকে। রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার কেবল প্রতিশ্রুতির তালিকাই নয়, জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের দলিল হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। ইশতেহার মূলত একটি রাজনৈতিক দলের শাসনদর্শন, নীতিগত অবস্থান ও আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনার লিখিত প্রতিফলন। আমাদের মতো উন্নয়নশীল ও জনবহুল দেশের নির্বাচনে ইশতেহারের গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ এটি সরাসরি নাগরিকের জীবনমান, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের সঙ্গে যুক্ত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ভিন্নতর। কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি, ডলার সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্ন- সব মিলিয়ে ভোটাররা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বাস্তবমুখী ও জবাবদিহিতামূলক ইশতেহার প্রত্যাশা করছেন। সম্ভাব্য ইশতেহারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অর্থনীতি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, জ্বালানি ব্যয় এবং পরিবহন খরচ ইশতেহারে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। গত এক দশকে দেশের গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছয়-সাত শতাংশের মধ্যে থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মুদ্রাস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ অর্থনীতির মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে ৯ শতাংশের আশেপাশে অবস্থান করেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মুখে পড়েছে। আমদানি ব্যয় ও জ্বালানি মূল্য অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। এই বাস্তবতায় ত্রয়োদশ নির্বাচনের ইশতেহারে অর্থনীতির বিষয়ে যে বিষয়গুলো তথ্যভিত্তিকভাবে আসা জরুরি বলে মনে করি, সেগুলো হলো-মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মৌদ্রিক নীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়, ভর্তুকি ব্যবস্থার লক্ষ্যভিত্তিক সংস্কার, বাজার তদারকি, সিন্ডিকেট ভাঙার কৌশল, কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের স্বার্থ রক্ষার পরিকল্পনা ও অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর কৌশল। ইশতেহারে কেবল প্রবৃদ্ধির হার উল্লেখ নয়, বরং স্থিতিশীলতা ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর সূচকভিত্তিক পরিকল্পনা থাকাই বাস্তবসম্মত। পূর্ববর্তী ইশতেহারগুলোয় ‘উন্নয়ন’ শব্দটি গুরুত্ব পেয়েছিল, তবে ১২ তারিখের নির্বাচনে ভোটাররা উন্নয়নের পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বাস্তব রোডম্যাপ দেখতে আগ্রহী।
দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশ কর্মক্ষম বয়সে। প্রতি বছর প্রায় ২০-২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে, অথচ আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানের হার তুলনামূলকভাবে কম। আমাদের দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। তাই কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন সবসময় ইশতেহারের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব, ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি খাতে সম্ভাবনা এবং বিদেশগামী শ্রমিকদের অধিকার-এসব বিষয় আলাদা গুরুত্ব দিতে হবে। পূর্ববর্তী ইশতেহারগুলোয় কর্মসংস্থানের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবতায় কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি। অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে এবং উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব একটি কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে সবকিছু তথ্যভিত্তিকভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। কোন খাতে কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, কারিগরি ও দক্ষতা উন্নয়নে বরাদ্দের পরিমাণ, প্রবাসী শ্রমবাজারে নতুন দেশের সঙ্গে চুক্তি, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা তহবিল এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতে চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি। এখানে প্রতিশ্রুতি নয়, পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
শিক্ষা খাত ঐতিহ্যগতভাবেই ইশতেহারের অংশ হলেও ত্রয়োদশ নির্বাচনে এর চরিত্র বদলাচ্ছে। এখন প্রশ্ন শুধু অবকাঠামোগত নয়; বরং মান, গবেষণা ও সেবার সমতা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা খাত বিস্তার থেকে গুণগত মানের ওপর জোর দিতে হবে। গত দুই দশকে শিক্ষা অবকাঠামো ও শিক্ষার্থী ভর্তির হার বেড়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সূচকে শিক্ষার গুণগত মান ও গবেষণা উৎপাদন এখনো সীমিত। এর পেছনে কিছু প্রধান প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। শিক্ষার বড় অংশ মুখস্থনির্ভর, কারিগরি ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম, উচ্চশিক্ষায় গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ সীমিত। এ নির্বাচনের ইশতেহারে তাই শিক্ষা বিষয়ে তথ্যনির্ভর অঙ্গীকার দেওয়া উচিত।
জিডিপির কত শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হবে, যার মধ্যে থাকবে পাঠ্যক্রম সংস্কারের সময়সীমা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল শিক্ষার বিস্তার ও গবেষণায় বিনিয়োগ। স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের অন্যতম সমস্যা হলো উচ্চ ব্যক্তিগত ব্যয়। মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশই আসে ব্যক্তির পকেট থেকে, যেটি নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য বড় চাপ তৈরি করে। এছাড়া রয়েছে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে চিকিৎসক ও যন্ত্রপাতির ঘাটতি, শহরকেন্দ্রিক বিশেষায়িত সেবা, ওষুধ ও ডায়াগনস্টিক ব্যয় বৃদ্ধি। ইশতেহারে স্বাস্থ্য বিষয়ে তথ্যভিত্তিক আলোচনা ছাড়া প্রতিশ্রুতি অর্থবহ হওয়ার সম্ভাবনা শূন্য শতাংশ। উপজেলা পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দ বৃদ্ধির হার, ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে নীতিগত সংস্কার ও স্বাস্থ্য বীমা বা সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো জোরদার করতে হবে। দুর্নীতি ও সুশাসন প্রশ্নটি প্রতিটি নির্বাচনের ইশতেহারেই থাকে।
হাসিনা সরকারের ইশতেহারে দুর্নীতি দমনের উল্লেখ থাকলেও তারাই সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি অপকর্মে পটু ছিল। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। ভোটারদের আস্থার প্রশ্নে সুশাসন ও দুর্নীতি দমন ইশতেহারের সবচেয়ে সংবেদনশীল অধ্যায়। আগের নির্বাচনে দেওয়া অনেক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন থাকায় এবার রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও স্পষ্ট ও পরিমাপযোগ্য অঙ্গীকার করা ছাড়া জনগণের আস্থা অর্জন করা অসম্ভব। কোনো প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে শক্তিশালী করা হবে, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণে সময়সূচি, দুর্নীতি দমন সংস্থার কার্যকারিতা বৃদ্ধি ও সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতার ব্যবস্থা। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি কার্যকর হয় না। এই বাস্তবতা ইশতেহারে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। তাই ইশতেহারে গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অধিকারের বিষয়টি শুধু বক্তব্য নয়, কাঠামোগত সংস্কারের আলোচনায় রাখতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ গত ১৬ বছর জনগণের মতের কোনো দাম দেওয়া হয়নি। নির্বাচন ব্যবস্থা, সংসদের কার্যকর ভূমিকা এবং বিরোধী দলের রাজনৈতিক পরিসর- এসব বিষয় ইশতেহারে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। সংসদের কার্যকারিতা বাড়ানোর সংস্কার, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ, স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান, নাগরিক অধিকার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাংবিধানিক সুরক্ষা প্রয়োজন। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ত্রয়োদশ নির্বাচনের ইশতেহারে পররাষ্ট্রনীতি আগের তুলনায় বেশি সুসংগঠিতভাবে চিন্তা করতে হবে। বাংলাদেশের রপ্তানি, প্রবাসী আয় ও উন্নয়ন সহযোগিতা পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। বৈশ্বিক মন্দা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইশতেহার থাকা জরুরি।
বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় শীর্ষের দিকে। তাই ইশতেহারে পরিবেশ প্রশ্নটি উন্নয়ন থেকে আলাদা নয়, বরং উন্নয়নের প্রধান শর্ত। পরিবেশ, নদী রক্ষা, জলাবদ্ধতা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইশতেহারের একটি আলাদা অধ্যায় হওয়া স্বাভাবিক। উপকূলীয় ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার সুরক্ষা পরিকল্পনা, সবুজ উন্নয়ন পরিকল্পনা, জলবায়ু তহবিল ব্যবহারের স্বচ্ছতা, নগর জলাবদ্ধতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে জনগণের নিরাপত্তা নেই বললেই চলে। তাই জননিরাপত্তার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতির দলিল নয়। এটি হবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার প্রতিফলন। বর্তমান বাস্তবতায় ভোটাররা আর শুধু উন্নয়নের স্লোগানে বিশ্বাস করতে পারছেন না। বাস্তবসম্মত, সময়োপযোগী ও জবাবদিহিতামূলক প্রতিশ্রুতি প্রত্যাশা করছেন। এই নির্বাচনের ইশতেহার কতটা বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিকতা, বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং জনগণের সঙ্গে সত্যিকার সংযোগের ওপর।
শেষ পর্যন্ত জনগণের রায়ই নির্ধারণ করবেÑকোন দলের ইশতেহার বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার কেবল প্রতিশ্রুতির দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না। বর্তমান বাস্তবতায় ভোটারদের আকাক্সক্ষা-তথ্যনির্ভর, সময়সীমা, লক্ষ্যভিত্তিক, বাস্তবায়নযোগ্য ও জবাবদিহিতামূলক ইশতেহার। যে রাজনৈতিক দল এই মানদণ্ডে নিজেদের ইশতেহার উপস্থাপন করতে পারবে, জনগণের আস্থা অর্জনে তারা এগিয়ে থাকবে। এ নির্বাচন শুধু ক্ষমতা নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিগত সক্ষমতার পরীক্ষাও বটে।
শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post