দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য চাল নিয়ে চালবাজি একশ্রেণির ব্যবসায়ীর মজ্জাগত স্বভাব। তাদের হাতে দীর্ঘদিন ধরে এই মৌলিক খাদ্যপণ্যের বাজার জিম্মি। প্রচুর মজুত থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকটের নানা চিত্র মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছে। যৌক্তিক কোনো কারণ ছাড়াই বাড়ানো হয় চালের দাম। শুধু চাল নয়, অন্যান্য নিত্যপণ্যের বাজারেও তারা একই আচরণ করেন। তাদের অনেকেই ব্যাংকিং ব্যবস্থাকেও কার্যত তামাশায় পরিণত করেছেন। আবদুর রশিদ নামের এক চাল ব্যবসায়ীর ঘটনা সেই ভয়াবহ বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।
তিনটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার ঋণ নিয়ে নিয়মিত পরিশোধ না করেও দিব্যি ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার নজির শুধু ব্যাংকিং অনিয়ম নয়, এটি রাষ্ট্রীয় দুর্বলতার নগ্ন প্রকাশ। ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বছরে ৩০০-৪০০ কোটি টাকা মুনাফা করা একজন ব্যবসায়ী যদি সামান্য দায় পরিশোধ না করে ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ হন, তবে প্রশ্ন উঠবেইÑব্যাংকগুলো কাদের স্বার্থে কাজ করছে?
আরও উদ্বেগজনক হলো, ঋণখেলাপি হয়েও চাল আমদানির জন্য এলসি খোলার সুযোগ পাওয়া। ‘জরুরি খাদ্যপণ্য’ যুক্তি দেখিয়ে রাষ্ট্র যখন বিশেষ সুবিধা দেয়, তখন সেই সুবিধা যদি বাজার নিয়ন্ত্রণকারী, মামলাবাজ ও ঋণখেলাপিদের হাতে যায়, তাহলে সাধারণ ভোক্তার স্বার্থ কোথায়?
খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এনআই অ্যাক্টে একাধিক মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও আবদুর রশিদ ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন। কারণ তিনি চালের বাজারের ‘সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী’। এই যুক্তিই কি আইনের ঊর্ধ্বে থাকার লাইসেন্স? বাজারে সামান্য অস্থিরতা সৃষ্টি হলেই চালের দাম কেজিতে চার-পাঁচ টাকা বাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা যদি কারও থাকে, তবে সেটি সরাসরি ভোক্তা স্বার্থবিরোধী অপরাধ। এই অপরাধকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।
আরও ভয়াবহ হলো, ব্যাংক ঋণ এড়িয়ে নগদ লেনদেনে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা। এটি শুধু অর্থপাচার ও কর ফাঁকির ঝুঁকি বাড়ায় না, পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে। অথচ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। ব্যক্তিগত সম্পদের পাহাড়, দেশজুড়ে জমি, মিল, কারখানা, আলিশান বাড়ি, দামি গাড়ি-সবই আছে; নেই শুধু রাষ্ট্রের প্রতি ন্যূনতম দায়বদ্ধতা। এই বৈষম্যই আজ দেশের ব্যাংক খাতকে নৈতিক সংকটে ঠেলে দিয়েছে। প্রশ্ন হলো-ভাবে আর কত দিন? ঋণখেলাপিদের জন্য আলাদা আইন, আলাদা সুবিধা আর সাধারণ মানুষের জন্য শুধু মূল্যবৃদ্ধির বোঝা-এই দ্বিচারিতা কি চলতেই থাকবে? এক দেশে দুই নিয়ম চলতে পারে না। ব্যাংক ব্যবস্থায় এই নৈতিক সংকটের উত্তরণ জরুরি।
রাষ্ট্রকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে শক্ত মনিটরিং, ঋণখেলাপিদের সব ধরনের সুবিধা স্থগিত এবং ব্যাংকগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। নইলে ‘চালবাজারের মাফিয়া’ শুধু বাজার নয়, পুরো অর্থনীতিকেই জিম্মি করে ফেলবে, যার মূল্য দেবে সাধারণ মানুষ। পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির পাহাড়াদার ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও স্বচ্ছ করতে হবে। ঋণ প্রদান ও এলসি-সংক্রান্ত বিষয়গুলো শক্তহাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post