নিজস্ব প্রতিবেদক : ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনৈতিক ও বিধিবহির্ভূতভাবে বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট বরাদ্দের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক দুই কমিশনারসহ মোট আটজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। নতুন করে সংশ্লিষ্ট আরও ১০ জনের অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের নির্বাচনে সহায়তা করে এবং তার উপহার হিসেবে অবৈধভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারের কাছ থেকে এই সুবিধা নেওয়া হয়েছে।
গতকাল সোমবার দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মো. আল-আমিন বাদী হয়ে মামলাটি করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম। অভিযোগটির তদারককারী কর্মকর্তা হিসেবে হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-৩-এর পরিচালক মো. বেনজীর আহম্মেদ।
দুদক জানায়, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ‘গৃহায়ন ধানমন্ডি (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্পে অনৈতিক ও বিধিবহির্ভূতভাবে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে দায়িত্বে থেকেও আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ২২২তম ও ২২৫তম বোর্ড সভায় বৈষম্যমূলক ও বেআইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
অভিযোগ থেকে জানা যায়, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় অবস্থিত অন্যান্য ফ্ল্যাটের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ আয়তনের চারটি ফ্ল্যাট (বাড়ি নম্বর ৭১১, সড়ক নম্বর ১৩-এ) একত্র করে দুটি ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট নির্মাণ ও বরাদ্দের অনুমোদন দেওয়া হয়। ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট দুটির আয়তন যথাক্রমে ৪ হাজার ১০৫ বর্গফুট এবং ৪ হাজার ৩০৮ বর্গফুট। এ ক্ষেত্রে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে স্থাপত্য নকশা অনুমোদনের অভিযোগও আনা হয়েছে।
মামলার আসামিরা হলেন দুদকের সাবেক কমিশনার মো. জহুরুল হক, সাবেক সিনিয়র সচিব ও দুদকের সাবেক কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান মো. দেলওয়ার হায়দার, সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) মো. শাহজাহান আলী, সদস্য (ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা) ড. মো. মইনুল হক আনছারী, সদস্য (পরিকল্পনা, নকশা ও বিশেষ প্রকল্প) বিজয় কুমার মণ্ডল, প্রকল্প পরিচালক কাজী ওয়াসিফ আহমাদ এবং সাবেক রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে-দুদকের সাবেক কমিশনার মো. জহুরুল হক পাবলিক সার্ভেট হিসেবে ক্ষমতার অপব্যাবহার করে ডুপ্লেক্স ফ্লাট বরাদ্দ নিয়ে অপরাধ করেছেন। দুদকের সাবেক কমিশনার ড. মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক উত্তরা আবাসিক এলাকায় ৭ দশমিক ৫ কাঠার এক কোটি ২১ লাখ টাকার প্লট থাকার পরও প্রতারণা করে মিথ্যা হলফনামা প্রদান করে অপরাধ করেছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে আসে। এছাড়া সাবেক রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে উত্তরা মডেল টাউন প্রকল্পে পাঁচ কাঠার একটি প্লট থাকার পরও আবেদনের প্রসপেক্টাসে মিথ্যে হলফনামা দেওয়ার অপরাধে দুদক আইনের ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় অপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত হয়েছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এদিকে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান মো. দেলওয়ার হায়দার, সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) মো. শাহজাহান আলী, সদস্য (ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা) ড. মো. মইনুল হক আনছারী, সদস্য (পরিকল্পনা, নকশা ও বিশেষ প্রকল্প) বিজয় কুমার মণ্ডল, প্রকল্প পরিচালক কাজী ওয়াসিফ আহমাদ বোর্ড সভায় বৈষম্যমূলক ও বিধিবহির্ভূতভাবে দুদকের দুই কমিশনারকে প্রসপেক্টাসে লিখিত আয়তনের থেকে দ্বিগুন আয়তনের দুটি ফ্লাট সংস্থান রাখার অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪০৯, ৪২০ ও ১০৯ ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় মামলা করা হয়েছে।
এছাড়া অভিযোগ সংশ্লিষ্ট আরও ১০ জনের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তাদের সম্পদ বিবরণী দাখিলের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(১) ধারায় নোটিশ জারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তারা হলেন, দুদকের সাবেক কমিশনার মো. জহুরুল হক, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মো. ইউনুসুর রহমান, সাবেক সিনিয়র সচিব ও দুদকের সাবেক কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রনালয়ের সাবেক সচিব এম এ কাদের সরকার, বর্তমান বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কতৃপক্ষের চেয়ারম্যান ড. এম আসলাম আলম। আরো রয়েছেন, সরকারি কর্ম কমিশনের সাবেক সচিব আকতারী মমতাজ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম খান, সাবেক রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম। দুদকের আরও অনুসন্ধান করা হবে সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. আনিছুর রহমান, স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব এসএম গোলাম ফারুকের বিরুদ্ধে।
উল্লেখ্য, একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচারের পর গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর দুদক বিষয়টি তদন্ত শুরু করে। বর্তমানে দুদকের সহকারী পরিচালক মো. আল-আমিনের নেতৃত্বে উপ-সহকারী পরিচালক নাহিদ ইসলামসহ তদন্ত দল অভিযোগ যাচাই করছে।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post