বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। জাতীয় সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠান শুধু ক্ষমতার পালাবদলের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রতীক্ষার পর গণতান্ত্রিক ধারায় প্রত্যাবর্তনের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন-এর শপথবাক্য পাঠের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে নতুন মন্ত্রিসভা।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের ফলে সরকার পরিচালনায় দৃঢ়তা যেমন থাকবে, তেমনি বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সংসদকে কার্যকর বিতর্ক, জবাবদিহি ও নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে পরিণত করতে পারলেই এই বিজয়ের প্রকৃত সার্থকতা আসবে।
নতুন মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের পাশাপাশি টেকনোক্র্যাটদের অন্তর্ভুক্তি একটি বাস্তবধর্মী দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দেয়। অর্থনীতি, বিনিয়োগ, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের মতো খাতে দ্রুত আস্থা পুনর্গঠন এখন সময়ের দাবি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপে থাকা অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে সাহসী কিন্তু পরিমিত নীতিনির্ধারণ প্রয়োজন। ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ, নীতির ধারাবাহিকতা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।
পররাষ্ট্রনীতিতেও ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল অপরিহার্য। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণ নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। ইতোমধ্যে ভারত সফরের আমন্ত্রণ কূটনৈতিক যোগাযোগের ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। একই সঙ্গে চীন, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণেও উদ্যোগী হতে হবে।
তবে রাজনৈতিক বিজয়ই শেষ কথা নয়; সামনে রয়েছে সুশাসন প্রতিষ্ঠার কঠিন পরীক্ষা। আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ নিশ্চিত করতে না পারলে জনআকাঙ্ক্ষা দ্রুত হতাশায় রূপ নিতে পারে। নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা।
দেশের জনগণ যে প্রত্যাশা নিয়ে নতুন নেতৃত্বকে দায়িত্ব দিয়েছে, তা পূরণে বিচক্ষণতা, সহনশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব অপরিহার্য। গণতন্ত্রের এই নতুন অধ্যায় যেন স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি রচনা করে— সেটিই এখন সবার প্রত্যাশা।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post