নিজস্ব প্রতিবেদক : টানা পাঁচদিনের আনন্দঘন পূজা-অর্চনার পর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে। রাজধানীর ঐতিহাসিক বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার শেষ হয় এই মহোৎসব। নদীতীরে হাজার হাজার ভক্তের উপস্থিতি আর তাদের চোখেমুখে বিষাদ ও আবেগের ছাপ ছিল স্পষ্ট- কারও চোখে অশ্রু, কারও ঠোঁটে দেবীর বন্দনা, কেউ বা নদীর জলে নিজ ও পরিবারের সদস্যদের অঞ্জলি দিয়ে প্রার্থনায় মগ্ন।
পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার থেকে আগত নবনীতা বর্মণ বলেন, ‘এই ক’দিন যেন স্বপ্নের মতো কেটেছে। মা দুর্গা আমাদের মাঝে ছিলেন, চারপাশ ভরে উঠেছিল আনন্দে। এখন তিনি চলে যাচ্ছেন, এই কষ্ট মেনে নিতে হবে। আবারও এক বছরের অপেক্ষা।’
পূজা উদযাপন কমিটির ধানমন্ডি থানার সহ-সভাপতি বিশ্বজিৎ রায় বলেন, ‘ভারাক্রান্ত হƒদয়ে মাকে বিদায় জানাচ্ছি। মা এসেছিলেন অসুর বধ ও মঙ্গল বয়ে আনতে। আমরা প্রার্থনা করেছি দেশের শান্তি ও মানবকল্যাণের জন্য।’
গতকাল সকাল থেকে রাজধানীর প্রতিটি পূজামণ্ডপে ভক্তদের ঢল নামে। নির্ধারিত সময়ে পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ, ঢাক-কাশির তালে এবং শঙ্খধ্বনিতে বিজয়া দশমীর পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ভক্তরা দেবীর পায়ে ফুল, ফল ও ভোগ নিবেদন করে শেষবারের মতো প্রণাম জানাতে মণ্ডপে উপস্থিত হন। বিজয়া দশমীর অন্যতম আকর্ষণ ‘সিঁদুর খেলা’য় অংশ নিতে বিবাহিত নারীরা রঙিন শাড়িতে সেজে উৎসবে মাতেন। সিঁদুর মেখে তারা একে অপরকে শুভেচ্ছা জানান এবং পরিবারের মঙ্গল কামনা করেন। শাঁখারী বাজারের পূজামণ্ডপে সিঁদুর খেলার সময় দেখা যায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে দেবীর চরণে অঞ্জলি দিচ্ছেন, কেউ মনের বাসনা পূরণের প্রার্থনা করছেন, আবার কেউ বিদায়ের কষ্টে চোখ মুছছেন। সেখানে অংশ নিতে আসা শিলা রানী বলেন, ‘সিঁদুর খেলার মাধ্যমে আমরা প্রত্যাশা করি-মা দুর্গা যেন আমাদের পরিবারে শান্তি ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসেন।’
অংশ নিতে আসা স্বর্ণা মজুমদার জানান, আমি দেবীর কাছে প্রার্থনা করেছি, যেন পরিবার ভালো থাকে, স্বামী-সংসারে সুখ বজায় থাকে এবং দেশের প্রতিটি মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারে।
এদিকে প্রতিমা বিসর্জনকে ঘিরে রাজধানীজুড়ে নেয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) ফারুক হোসেন জানান, বিসর্জন ও শোভাযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে প্রায় ২ হাজার ৪০০ অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি নদীর ঘাটগুলোতে স্থাপন করা হয় অস্থায়ী ওয়াচ টাওয়ার, মোতায়েন ছিল সোয়াট, বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল, নৌ পুলিশ, ডুবুরি দল, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। দেশজুড়ে হাজারও পূজামণ্ডপে একই আবেগঘন পরিবেশে বিদায় জানানো হয় দেবী দুর্গাকে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রতি শরতে দেবী দুর্গা স্বামীর গৃহ কৈলাস থেকে কন্যারূপে পিতৃগৃহে আসেন। পাঁচদিন ভক্তদের মাঝে অবস্থান শেষে বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে ফিরে যান কৈলাসে। যদিও বিসর্জনের মাধ্যমে দেবীর বিদায় জানানো হয়, তবুও ভক্তদের মনে থেকেই যায় পরের বছর তার পুনরাগমনের আশা ও অপেক্ষা। আবেগ, উৎসব, ধর্মীয় অনুশাসন আর সামাজিক সম্প্র্রীতির এক অপূর্ব মেলবন্ধনে ২০২৫ সালের শারদীয় দুর্গোৎসব শেষ হলেও, হƒদয়ের গহীনে রেখে যায় এক বছরের অপার প্রতীক্ষা।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post