নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের ব্যাংক ও বীমা খাতের শীর্ষ পর্যায়ে পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া ব্যাংক ও বীমা খাতের প্রধান নির্বাহীরা একে একে সরে দাঁড়াচ্ছেন। তবে এগুলো সরকারের নির্দেশনায় পদত্যাগ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে সকালে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে তার কাজ স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যেতে বললেও দুপুরের মধ্যে খবর আসে তিনি আর স্বপদে নেই। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার পরিবর্তনের পর শীর্ষ পদে রদবদল অস্বাভাবিক নয়; নতুন সরকার প্রশাসনিক সমন্বয় ও নীতিগত বোঝাপড়া জোরদার করতে নিজের পছন্দ অনুযায়ী নেতৃত্ব নির্ধারণ করে থাকে। ফলে পদত্যাগের তালিকা আরও দীর্ঘ হতে পারে বলে সরকারের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
পদত্যাগকারীদের মধ্যে রয়েছেন-সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান ড. এম আসলাম আলম, সাধারণ বীমা করপোরেশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারী।
গতকাল সোমবার আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বরাবরে পাঠানো পৃথক চিঠিতে তারা পদত্যাগের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান।
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন। তিনি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব বরাবর চিঠি দিয়ে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জানান।
এর আগে তিনি মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) এবং অর্থসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট তাকে সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেন।
বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান ড. এম আসলাম আলমও পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। চিঠিতে তিনি ব্যক্তিগত কারণ উল্লেখ করে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখা সম্ভব নয় বলে জানান এবং পদত্যাগ গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন।
অভিযোগ রয়েছে, পদত্যাগ করা আইডিআরএ চেয়ারম্যান বীমা কোম্পানিগুলোর ব্যয় পাঁচগুণ বাড়িয়েছেন। নিবন্ধন নবায়ন ফি বাড়ানোর মাধ্যমে এই ব্যয় বাড়ানো হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের একদম শেষ সময়ে এই ব্যয় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আসে। বীমা কোম্পানির নিবন্ধন ব্যয় বাড়ায় মূল ভুক্তভোগী হবেন সাধারণ গ্রাহকরা।
গত ৪ ফেব্রুয়ারি জীবন (লাইফ) ও সাধারণ (নন-লাইফ) বীমা কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন নবায়ন ফি পাঁচগুণ বাড়ানো-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়। এর প্রায় এক মাস পর ‘ব্যক্তিগত অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে আইডিআরএ চেয়ারম্যান অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
আইডিআরএ সূত্র জানায়, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে এক অভ্যন্তরীণ বৈঠকে তিনি পদত্যাগের ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। সর্বশেষ আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার মাধ্যমে তার দায়িত্বের ইতি ঘটল।
ড. আসলাম আলম ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন। সাবেক সিনিয়র সচিব হিসেবে তিনি তিন বছরের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলেন, তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। কিন্তু মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই দায়িত্ব ছাড়লেন তিনি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, আসলাম আলম পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে তার পদত্যাগ কার্যকর করতে ফাইল তৈরি করে অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে। এরপর প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিলে পদত্যাগ কার্যকর হবে।
এদিকে সম্প্রতি আইডিআরএ’র সুপারিশে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ‘বীমা ব্যবসার নিবন্ধন ফি বিধিমালা, ২০১২’ সংশোধন করে গেজেট প্রকাশ করেছে। গেজেট অনুযায়ী, ২০২৬, ২০২৭ ও ২০২৮ সালে নিবন্ধন নবায়ন ফি হবে প্রতি হাজার টাকা গ্রস প্রিমিয়াম আয়ের বিপরীতে ২ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ কোনো কোম্পানি এক কোটি টাকা প্রিমিয়াম আয় করলে পরবর্তী বছরের নিবন্ধন নবায়নের জন্য তাকে ২৫ হাজার টাকা ফি দিতে হবে।
এরপর ২০২৯, ২০৩০ ও ২০৩১ সালে হার বাড়িয়ে প্রতি হাজারে চার টাকা এবং ২০৩২ সাল ও তার পরবর্তী সময়ের জন্য পাঁচ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে এই হার ছিল প্রতি হাজারে এক টাকা।
বর্তমান হার শূন্য দশমিক ১ শতাংশ থেকে চূড়ান্ত ধাপে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হবে। অর্থাৎ প্রতি হাজারে অতিরিক্ত ৪ টাকা বা শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বাড়তি ব্যয় বহন করতে হবে বীমা কোম্পানিগুলোকে। প্রথম ধাপেই (২ দশমিক ৫০ টাকা) কোম্পানিগুলোকে প্রতি হাজারে ১ দশমিক ৫০ টাকা অতিরিক্ত দিতে হবে।
নিবন্ধন ফি বাড়ানোর প্রস্তাবে আইডিআরএ জানায়, ভবিষ্যতে সংস্থাটির ব্যয় অন্তত চারগুণ বাড়তে পারে। বর্তমানে প্রতি হাজার টাকা গ্রস প্রিমিয়ামের বিপরীতে এক টাকা নেওয়া হলেও তা দিয়ে বাড়তি প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হবে।
ফি বৃদ্ধির পক্ষে যেসব কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে-দুয়ার সার্ভিস লিমিটেডপরিচালিত আইআইএমএস প্ল্যাটফর্মের বিল পরিশোধ, জনবল বৃদ্ধি ও পেনশন-গ্র্যাচুইটি প্রদান, নিজস্ব ভবন নির্মাণ ও শাখা অফিস স্থাপন এবং বীমা খাতে পেশাদারত্ব উন্নয়নে বিসিআইআই, বিআইআইএম ও ‘অ্যাকচ্যুয়ারিয়াল সোসাইটি অব বাংলাদেশ’-এর মতো প্রতিষ্ঠানের বিকাশে সহায়তা।
আইডিআরএ’র আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে সংস্থাটির মোট আয় ছিল ২৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা এসেছে নিবন্ধন ও নবায়ন ফি থেকে। বাকি অর্থ এসেছে রিভিউ ফি, শাখা রেজিস্ট্রেশন ফি, এজেন্সি লাইসেন্স ফি, জরিমানা, এফডিআর সুদ ও অন্যান্য উৎস থেকে।
একই অর্থবছরে মোট ব্যয় হয় ১১ কোটি ২ লাখ টাকা। আয়কর বাবদ ৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা প্রভিশন বাদ দেওয়ার পর উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ১১ কোটি ১৬ লাখ টাকা। ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সংস্থাটির মোট তহবিল ছিল ১০৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
এমন সময়ে ফি বাড়ানো হলো, যখন দেশের বীমা খাতে গ্রাহক আস্থা সংকট, দাবি পরিশোধে বিলম্ব ও বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। ফলে বাজার সম্প্রসারণ ও গ্রাহক সুরক্ষা জোরদারের চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত খাতটির জন্য মিশ্র বার্তা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করা শর্তে একটি বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বলেন, বীমা কোম্পানির নিবন্ধন ব্যয় বাড়ানোর কারণে মূলত গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বীমা গ্রাহকদের লভ্যাংশের পরিমাণ কমে যাবে।
তিনি বলেন, এমনিতেই কিছু কোম্পানি গ্রাহকদের দাবির টাকা ঠিকমতো পরিশোধ করতে পারছে না। ফলে বীমার প্রতি মানুষের চরম আস্থা সংকট রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যয় বাড়ানোর ফলে বীমার প্রতি গ্রাহকের আস্থা আরও কমে যেতে পারে।
আরেকটি বীমা কোম্পানির সিইও বলেন, নিবন্ধন নবায়ন ফি কোম্পানির নিজস্ব ব্যয় হলেও বাড়তি ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের ওপরই পড়বে। অপারেশনাল ব্যয় বাড়লে প্রিমিয়াম কাঠামো, কমিশন, প্রশাসনিক ব্যয় বা সেবার মানে পরিবর্তন আসবে।
তিনি বলেন, এখন তো তিনি (আসলাম আলম) চলে যাচ্ছেন। কিন্তু যাওয়ার আগে কোম্পানিগুলোর ওপর বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে গেলেন। বীমা খাতের ওপর এমনিতেই আস্থা সংকট। এখন লভ্যাংশ কমে গেলে, গ্রাহকের আস্থা আরও কমে যাবে। তাই নতুন সরকারের নিবন্ধন নবায়ন ফি বাড়ানোর বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসের মাথায় সেপ্টেম্বরে সাবেক সিনিয়র সচিব ড. এম আসলাম আলমকে আইডিআরএ চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। এর পর থেকেই তিনি দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সাধারণ বীমা করপোরেশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারীও পদত্যাগ করেছেন।
পদত্যাগের বিষয়ে জয়নুল বারী জানান, আসলে ব্যক্তিগত কারণেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার পরিবর্তনের পর গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে রদবদল স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। নতুন সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক গতিশীলতা বাড়াতে এ ধরনের পরিবর্তন ভূমিকা রাখে। ফলে ব্যাংক ও বীমা খাতের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আসতে পারে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
সরকারি একটি সূত্র জানিয়েছে, পরিবর্তনের এই ঢেউ লাগতে পারে অন্যান্য সরকারি ব্যাংক ও বিশেষায়িত ব্যাংকের ওপর। এছাড়া পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি), রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা), বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনসহ (বিপিসি) একাধিক প্রতিষ্ঠানে।
ব্যাংক ও বীমা খাত দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত। তাই নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রভাব কতটা ইতিবাচক হবে, তা নির্ভর করবে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও নীতিগত সামঞ্জস্যের ওপর।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post