এফ আই মাসউদ : কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয়েছে বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয় ভোটগ্রহণ, শেষ হয় বিকাল সাড়ে ৪টায়। দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ৪২ হাজার ৯৫৮টি ভোটকেন্দ্রে এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত রয়েছে।
শান্তিপূর্ণভাবে ভোট প্রদান করতে পেরে তরুণ থেকে বৃদ্ধদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে উচ্ছ্বাস। এর মধ্যে এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে তিনি স্মার্টফোনে তুলেছেন সেলফি, করেছেন ফটোসেশন। নির্বাচন নয় যেন ঈদের আনন্দই উপভোগ করেছেন তারা। যারা এর আগে ভোট দিতে যাননি, তারাও এবার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রকাশ করেছেন নিজেদের অনুভূতি।
১২ ফেব্রুয়ারি দিনটি ছিল বহুল প্রতীক্ষিত। এদিন সকালে সূর্য ওঠার আগেই ঘুম থেকে উঠেছেন অনেকেই। আলসে বলে পরিবারে যে ছেলেটির ‘বদনাম’ রয়েছে, সেও সকালে হয়তো অন্যের ঘুম ভেঙেছে! কারণ এটা তো জাতির এমন এক জেগে ওঠার দিন; সেদিন কি আর ঘুমিয়ে থাকা যায়!
১৯৯১ সালে স্বৈরশাসক এরশাদের পতন হয়। এরপর শুরু হয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভিযাত্রা। নানা সংকট থাকলেও গত ১৬ বছরের শাসনামলে শেখ হাসিনা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করেছিল। কেড়ে নেওয়া হয় মানুষের মৌলিক অধিকার, ভোটের অধিকার। সে অধিকার ফিরিয়ে আনার লড়াইয়ে অগণিত মানুষকে হত্যা, গুম, নির্যাতন এবং কারাবরণ করতে হয়। এক দুঃসহ জীবনযাপন করতে হয় এ বদ্বীপের বাসিন্দাদের। চব্বিশের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানে বিদায় নেয় চরম ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। ১ হাজার ৪০০ প্রাণের বিনিময়ে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়। এ কারণে আজকের এ দিনে ভোট দিতে এসে ভোটারদের সে কী উল্লাস!
ঢাকা-১৫ আসনের পশ্চিম কাফরুলে হালিম ফাউন্ডেশনের স্কুলে ভোট দিতে আসা ফজলুর রহমানের কণ্ঠে ফুটে উঠেছে উচ্ছ্বাসের প্রতিধ্বনি। তিনি বলেন, আজকের এ ভোটের দিন নিয়ে আমি ও আমার পুরো পরিবারই খুবই উচ্ছ্বসিত। সকাল থেকে একটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, ভোটাররা কোনো ধরনের ভয়ভীতি ছাড়া ভোট দিতে আসছেন। আমরা এমন পরিবেশই চাই। এত সকালে লাইনে দাঁড়ানোর বিষয়ে বলেন, ভোটের পরিবেশ দেখার জন্য সকালে এসেছি। এখন পরিস্থিতি খুবই সুন্দর ও স্বাভাবিক। এটা বজায় থাকলে আমি ভোট দেওয়ার পর আম্মু ও বোনকেও ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাবেন বলে জানান তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ’তে অধ্যয়নরত এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, আমরা কোনো ধরনের নিবর্তনমূলক কোনো কিছু চাই না। যখনই কেউ জোর করে কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে ছাত্ররা, তা প্রতিরোধ করেছে। ছাত্ররা সবসময় ন্যায়ের পক্ষে, তাদের অবস্থান জানান দিয়েছে।
ওই কেন্দ্রের বাইরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন বিএনপি ও জামায়াতের দুই সমর্থক। দুইজনের গলায় দুই প্রার্থীর ছবিসম্বলিত নির্বাচনি কার্ড ঝুলছিল। বেশ হাসিখুশি মনে খোশগল্পে মশগুল দুজন। প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রধান দলের সমর্থকদের ভোটের দিনে এমন চিত্র বাংলাদেশে এর আগে খুব বেশি চোখে পড়েছে, এটা বলা যায় না। কিন্তু এবারের ভোটের পরিবেশে এমন সৌহার্দ্যপূর্ণ অবস্থান কেন্দ্রগুলোর আশেপাশে গেলেই দেখা মিলছে। আলাপে মশগুল থাকা ধানের শীষের সমর্থক মো. সেলিম বলেন, আমাদের এখানে কোনো সমস্যা নেই। আমরা সবাই মিলেমিশে ভোট দিচ্ছি। দুজন দুই দলের সমর্থক, কিন্তু তাই বলে আমরা কোনো ধরনের প্রতিহিংসার মধ্যে নেই। প্রত্যেকে যাতে নিজ দলের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেÑএমনটাই চাই। নুরুল হাসান নামে দাঁড়িপাল্লার সমর্থকের কণ্ঠেও যেন একই কথার প্রতিধ্বনি, আমরা এই প্রথম এমন একটা চমৎকার পরিবেশে ভোট দিচ্ছি। সত্যিই অনেক ভালো লাগছে। যে যার মতো তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছে। ভোটারদের মধ্যে কোনো আতঙ্ক নেই।
হুমায়ুন কবীর নামের একজন ভোটার বলেন, শেখ হাসিনার আমলে আমরা কোনো ভোট দিতে পারিনি। কেন্দ্র দখল করে নিজেরাই নিজেদের পক্ষে ভোট দিয়েছে। সাধারণ ভোটারদের ভোট দেওয়ার অধিকার ছিল না। আবদুল আলীম নামে আরও একজন ভোটার বলেন, সবশেষ ২০০৮ সালে ভোট দিয়েছিলেন। এরপর আর ভোট দিতেই পারেননি। ওই সময়ের পরিস্থিতির বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মিছিল-মিটিং পর্যন্ত করতে দেওয়া হয়নি।
৬১ বছর বয়সি মাহবুব আলম নামে একজন ভোটার বলেন, গত আওয়ামী লীগ আমলের একটি নির্বাচনেও ভোট দিতে পারিনি। কেন্দ্রে যাওয়ার আগেই বলেছে, ভোট হয়ে গেছে। কিন্তু এবার ভোটাররা খুবই ভালোভাবে তাদের ভোট দিতে পারছে, সকাল থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা কাজ করছে। আমি খুবই আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত।
মিরপুর সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন ঢাকা-১৪ আসনের ভোটার ষাটোর্ধ্ব ওমর ফারুক। তিনি বলেন, ভোট দেওয়া সম্পন্ন করে তার স্ত্রী তাকে ধরে খুবই সতর্কতার সঙ্গে কেন্দ্র থেকে বের হচ্ছিলেন। বাসা ভোটকেন্দ্রের পাশেই। ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না, উদ্দেশ্য একটি রিকশাযোগে বাসায় ফিরবেন। ভোটের পরিবেশের সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ঝামেলা হয় বলে আমি এর আগে ভোট দিতে আসিনি। এবার ভোট দিয়ে খুব ভালো লাগল। ভোটকেন্দ্রে যারা দায়িত্ব পালন করছেন, তারা আমাকে ধরে ভোট কেন্দ্রে দিয়ে আসেন। ভোট দেওয়া শেষ হলে আবার তারা আমাকে কেন্দ্রের বাইরে দিয়ে যান।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ঢাকা ১৪ আসনের ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়ে ২ নম্বর কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন তিন নারী। তাদের কাছে ভোট দেওয়ার অনুভূতি জানতে চাইলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে জানান, জীবনে এই প্রথমবারের মতো ভোট দিতে এসেছেন। প্রথমবার ভোট দেওয়ার অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে বড়বোন তাহমিনা আক্তার বলেন, জীবনে প্রথমবারের মতো ভোট দিলাম। এর আগে কখনো ভোট দেওয়ার সুযোগ হয়নি। কারণ এর আগে তো আসলে ভোট হয়নি। এবার খুবই সুষ্ঠুভাবে ভোট হচ্ছে বলে দিতে পেরেছি। একই সুরে কথা বলেন মেজবোন শিরিন আক্তারও, সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরতদের সহযোগিতার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, আমরা যেমনটা আশা করেছিলাম, তার থেকেও অনেক ভালোভাবে ভোট হচ্ছে। এখানে যারা দায়িত্বে আছেন, তারা আমাদের সবকিছু গুছিয়ে দিয়েছেন। লেখাপড়ার দিক দিয়ে মনে হয় ছোট বোন শারমিন আক্তার বড় দুই বোনের চেয়ে একটু বেশি শিক্ষিত। কথায় লাজুকতা থাকলেও পরিশীলিত। মিডিয়ার সামনে কথা বলতে একটু জড়তা থাকলেও গুছিয়ে বলার চেষ্টা করেন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছে অনেক চাওয়া শারমিনের। তিনি বলেন, কে নির্বাচিত হবে, সেটা ভোটাররা ঠিক করবে। তবে যেই নির্বাচিত হোন, তিনি যেন আমাদের কল্যাণে কাজ করে। আমরা চাই, দ্রব্যমূল্য কমানো হোক, কোনো ধরনের সিন্ডিকেট যেন না থাকে। দ্রব্যমূল্য যেন ২০০৬ সালের মতো সহনীয় পর্যায়ে থাকে। একইসঙ্গে আমরা সন্ত্রাস, দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজমুক্ত দেশ চাই।
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটারসংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন, পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২৩২ জন। দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী। নিরাপত্তা নিñিদ্র করতে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৯ লাখের বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় মাঠে ছিলেন ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।
নির্বাচনে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ছাড়া ৫০টি রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছে। অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে রয়েছেÑবিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় পার্টি প্রভৃতি। বহু বছর পর শঙ্কামুক্ত ভোটদানের প্রত্যাশা নিয়ে গ্রামেগঞ্জে গেছেন লাখো তরুণ, যুবক ও প্রবীণ।
গত ১১ ডিসেম্বের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী দুয়ারে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। এবারের নির্বাচনে ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৫ ভোটারের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রায় চার কোটি তরুণ ভোটদানের সুযোগ পায়। এছাড়া প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। তাদের সঙ্গে এই ব্যবস্থাপনায় ভোট প্রদান করেছেন নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বন্দিরা।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post