শেয়ার বিজ ডেস্ক: দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল বা বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রমে ভয়াবহ স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। রমজান মাস সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে। লাইটার বা ছোট জাহাজের তীব্র সংকটের কারণে খাদ্যশস্য, সার ও শিল্পের কাঁচামালসহ প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ লাখ মেট্রিক টন পণ্য নিয়ে সাগরে ভাসছে শতাধিক জাহাজ। এতে রমজানে পণ্যের ঘাটতি ও বাজারে দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত বহির্নোঙর ও কুতুবদিয়া চ্যানেলে মোট ১০৮টি পণ্যবাহী জাহাজ অপেক্ষমাণ ছিল। এসব জাহাজে রয়েছে ৪৫ লাখ টনের বেশি পণ্য। এর মধ্যে ১৭টি জাহাজে প্রায় ১২ লাখ টন রমজান সংশ্লিষ্ট খাদ্যপণ্য—গম, ভুট্টা, সয়াবিন, ছোলা, ডাল ও ভোজ্যতেল। এছাড়া পাঁচটি জাহাজে ২ লাখ টনের বেশি চিনি, সাতটি জাহাজে সার এবং ২৫টি জাহাজে সিমেন্টের ক্লিংকার বহন করা হচ্ছে।
শিপহ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ প্রতিটি মাদার ভেসেলকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬ লাখ টাকা করে ড্যামারেজ বা জরিমানা গুনতে হচ্ছে। এতে আমদানিকারকদের ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি এর প্রভাব পড়ছে ভোক্তা পর্যায়েও।
শিপ হ্যান্ডলিং ও বার্থ অপারেটরদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে ৫০ হাজার টন ধারণক্ষমতার একটি মাদার ভেসেল সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস শেষ করতে পারে। কিন্তু বর্তমান সংকটে সেই সময় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ থেকে ৩০ দিনে। কোনো কোনো জাহাজ দিনের পর দিন এক কেজি পণ্যও খালাস করতে পারছে না।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই সংকটের পেছনে শুধু লাইটার জাহাজের ঘাটতি নয়, বরং অব্যবস্থাপনা ও জাহাজের অপব্যবহারই বড় কারণ। জানা গেছে, কয়েক মাস ধরে খাদ্যশস্যবাহী অনেক লাইটার জাহাজ বিভিন্ন ঘাটে গিয়ে পণ্য খালাস না করে সাগরে ভাসছে। আমদানিকারকরা এসব জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করায় সেগুলো পুনরায় বহির্নোঙরে ফিরতে পারছে না। ব্যবসায়ী মহলের দাবি, এটি কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট সংকট।
সূত্র জানায়, বড় শিল্প গ্রুপগুলো তাদের নিজস্ব লাইটার জাহাজ দিয়ে পণ্য খালাস করলেও অধিকাংশ আমদানিকারককে বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) থেকে জাহাজ বুকিং নিতে হয়। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী লাইটার জাহাজ না পাওয়ায় অর্ধশতাধিক মাদার ভেসেলের পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএইচবিওএ) সভাপতি সরওয়ার হোসেন সাগর বলেন, ‘প্রতিদিন স্বাভাবিক পণ্য প্রবাহ বজায় রাখতে যেখানে ২০০ থেকে ৩০০ লাইটার জাহাজ প্রয়োজন, সেখানে এখন পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০ থেকে ৪০টি। ফলে খালাস কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে গেছে।’
বিডব্লিউটিসিসি এই সংকটের জন্য ঘন কুয়াশা এবং বিএডিসির সারের কাজে নিয়োজিত ১৪০টি জাহাজ আটকে থাকাকে দায়ী করলেও ব্যবসায়ীরা বলছেন, মূল সমস্যা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। সংকট নিরসনে জাহাজের সিরিয়াল প্রথা বাতিল করে উন্মুক্ত ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন অপারেটররা।
ইনল্যান্ড ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব চিটাগংয়ের (আইভোয়াক) সহসভাপতি পারভেজ আহমেদ জানান, বিডব্লিউটিসিসির অধীনে থাকা প্রায় ১ হাজার ২০০টি লাইটার জাহাজের মধ্যে ৩০০টি মোংলা বন্দরে চলে গেছে। এছাড়া ৬৮৭টি জাহাজ বহির্নোঙর থেকে পণ্য নিয়ে যাওয়ার পর খালাস শেষে ফিরে না আসায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। যেখানে স্বাভাবিকভাবে একটি লাইটার জাহাজের সর্বোচ্চ পাঁচ দিনে পণ্য খালাস করার কথা, সেখানে এখন এক থেকে দেড় মাস ধরে জাহাজগুলো আটকে আছে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, ‘লাইটার জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার বন্ধে কঠোর নজরদারি জরুরি। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে সব অংশীজনকে এক টেবিলে বসে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা না হলে রমজানে খাদ্যসংকট দেখা দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, অনেক আমদানিকারকের নিজস্ব জাহাজ অলস পড়ে আছে। জরুরি ভিত্তিতে নমনীয়তা দেখিয়ে বিকল্প জাহাজ ব্যবহারের সুযোগ দিলে অন্তত নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের খালাস সম্ভব হবে এবং সংকট অনেকটাই লাঘব করা যাবে।
সূত্র: বাসস।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post