গাজীপুর প্রতিনিধি : গাজীপুরের অন্যতম প্রধান সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও চরম সেবাসংকটে জর্জরিত-এমন অভিযোগে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
হাসপাতালটির পরিচালক ডা. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে তার অপসারণ দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন কর্মচারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
‘সচেতন গাজীপুরবাসী’ ব্যানারে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন, যার মধ্যে ছিল-“সাবেক প্রতিমন্ত্রীর সিন্ডিকেটে পরিচালকের হরিলুট” এবং “দুর্নীতিবাজ পরিচালকের অপসারণ চাই”।
আজ রোববার (৫ এপ্রিল) স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত হাসপাতালটি পরিদর্শনে এলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। টানা ছয় মাস ধরে বেতন না পাওয়া আউটসোর্সিং কর্মীরা ক্ষোভে তার গাড়ি অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
কর্মীদের অভিযোগ, ইচ্ছাকৃতভাবে বেতন আটকে রেখে নিয়োগ ও কাজ বণ্টনে দুর্নীতি করা হচ্ছে এবং স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় তারা পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলেও জানান।
অন্যদিকে রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ-হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যায় না, অধিকাংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাইরে করতে বাধ্য করা হয় এবং চিকিৎসার ব্যয় প্রায় সম্পূর্ণ রোগীকেই বহন করতে হয়। এমনকি কিছু চিকিৎসক রোগীদের নিজস্ব প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠিয়ে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে শিশু ওয়ার্ডে একটি বেডে একাধিক রোগী রাখা, ওষুধ ও যন্ত্রপাতির সংকট এবং অপরিষ্কার পরিবেশে মশা ও ছারপোকার উপদ্রব পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। স্বজনদের ভাষায়, এখানে চিকিৎসার চেয়ে ভোগান্তিই বেশি।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে- ওয়ার্ড ও বাথরুম অপরিষ্কার, খাবারের মান নিম্নমানের এবং সময়মতো চিকিৎসক পাওয়া যায় না। যদিও প্রতিমন্ত্রীর আগমনের আগে সাময়িকভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা করে ভিন্ন চিত্র উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে।
স্থানীয়দের দাবি, একটি প্রভাবশালী চক্র হাসপাতালের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে এবং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন কাজ বাগিয়ে নিচ্ছে। এমনকি একটি সংগঠনের নাম ব্যবহার করেও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ শোনার পর বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে অল্প সময় হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ নেতৃবৃন্দের সহযোগিতায় শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে পরিচ্ছন্ন ও সেবামুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হবে। রোগীর সেবার মান বৃদ্ধি, চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বাড়ানোসহ সব সমস্যা সমাধানে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য এম. মঞ্জুরুল করিম রনি, গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট ড. শহীদ উজ্জামান, গাজীপুর মেট্রো সদর থানা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান এলিস, গাজীপুর মহানগর জিয়া পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম মোল্লা, মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব মাহমুদ হাসান রাজু, গাজীপুর সদর মেট্রো থানা যুবদলের আহ্বায়ক নাজমুল খন্দকার সুমন, যুবদল নেতা ফরহাজ বিন প্রবালসহ মহানগর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্বল প্রশাসনিক নজরদারি, চিকিৎসকদের দ্বৈত প্র্যাকটিস, সরবরাহ ব্যবস্থার ভেঙেপড়া এবং জবাবদিহিতার অভাবই এই সংকটের মূল কারণ। দ্রুত সংস্কার, বকেয়া বেতন পরিশোধ, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং কঠোর তদারকি ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post