এফ আই মাসউদ : রিজার্ভের প্রধান উৎস পণ্য রপ্তানি আয় টানা সাত মাস ধরে নিম্নমুখী। গত বছরের আগস্ট থেকে শুরু হওয়া পতনের ধারা সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি পেরিয়ে চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারিতেও অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি আয় কমেছে ১২ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ। এতে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ঘোষিত পাল্টা শুল্ক এবং তা ঘিরে বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা রপ্তানি খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি যুক্ত হওয়ায় সামনে আরও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অষ্টম মাস ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ পণ্য রপ্তানি থেকে আয় করেছে ৩৪৯ কোটি ৫২ লাখ (৩ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন) ডলার। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে এই আয় ছিল ৩৯৭ কোটি ৩১ লাখ (৩ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন) ডলার। অর্থাৎ এক বছরে কমেছে ১২ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ। আগের মাস জানুয়ারির তুলনায়ও ফেব্রুয়ারির আয় কমেছে প্রায় ২১ শতাংশ। জানুয়ারিতে রপ্তানি আয় হয়েছিল ৪৪১ কোটি ৩৬ লাখ (৪ দশমিক ৪১ বিলিয়ন) ডলার।
এদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৯০ কোটি ৫৮ লাখ (৩১ দশমিক ৯ বিলিয়ন) ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ৩ হাজার ২৯৪ কোটি ২৬ লাখ (৩২ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন) ডলার। সে হিসেবে আট মাসে মোট রপ্তানি কমেছে ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। অর্থবছরের শুরুতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি থাকলেও পরবর্তী মাসগুলোয় ধারাবাহিক পতনের কারণে সামগ্রিক হিসাবে এখন ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।
জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রপ্তানিতে বড় উল্লম্ফন হয়েছিল। ওই মাসে আয় হয়েছিল ৪৭৭ কোটি (৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন) ডলার, যা আগের বছরের জুলাইয়ের তুলনায় ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ বেশি। রপ্তানিকারকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে বিপুল পরিমাণ পণ্য জাহাজীকরণ করায় জুলাইয়ে রপ্তানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছিল। অনেক স্থগিত অর্ডারও ওই সময় রপ্তানি করা হয়। কিন্তু আগস্ট থেকেই পতন শুরু হয়। আগস্টে কমে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে কমে ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ, অক্টোবরে কমে ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ, নভেম্বরে কমে ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ, ডিসেম্বরে বড় ধাক্কাÑ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ কম, জানুয়ারিতে কমে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ এবং ফেব্রুয়ারিতে কমে ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ। অর্থাৎ জুলাইয়ের উচ্চ প্রবৃদ্ধি ছিল মূলত সাময়িক, কাঠামোগত নয়।
পোশাক খাতেই বড় ধস: বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক। ফেব্রুয়ারিতে মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি এসেছে এই খাত থেকে। ফেব্রুয়ারিতে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ২৮১ কোটি ৫৯ লাখ (২ দশমিক ৮১ বিলিয়ন) ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের ৩২৪ কোটি ৪৪ লাখ (৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন) ডলারের তুলনায় ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ কম।
নিট পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ (১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার), ওভেন পোশাক রপ্তানি কমেছে ১০ দশমিক ৮৬ শতাংশ (১ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার)।
অর্থবছরের আট মাসে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ২৫ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ কম। এই সময়ে মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ দশমিক ৮৫ শতাংশ এসেছে পোশাক খাত থেকে। এতে স্পষ্ট, পোশাক খাতে সামান্য ধাক্কাও সামগ্রিক রপ্তানিকে বড় আকারে প্রভাবিত করছে।
বাংলাদেশের প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক কাঠামো পরিবর্তন এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের প্রভাব পড়েছে পোশাক আমদানিতে। একই সঙ্গে চীন ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে বাড়তি শুল্কের চাপে ইউরোপীয় বাজারে বেশি করে পণ্য সরবরাহ করছে। অনেক ক্ষেত্রে কম দামে অর্ডার নিচ্ছে তারা। ফলে ইউরোপেও বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতির স্থিতিশীলতার দুটি প্রধান ভিত্তিÑরপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স। চলতি অর্থবছরের শুরুতে দুই ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও এখন রপ্তানি আয় টানা কমছে। জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় সব মাসেই রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে। জানুয়ারিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪৫ দশমিক ১১ শতাংশ ও ফেব্রুয়ারিতে বেড়েছে ১৯ দশমিক ৫২ শতাংশ।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু রেমিট্যান্স দিয়ে রপ্তানি আয়ের ঘাটতি পূরণ সম্ভব নয়। রপ্তানি আয় কমতে থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়বে, আমদানি ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হবে।
এদিকে ফেব্রুয়ারিতে কৃষিপণ্য রপ্তানি কমেছে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য কমেছে ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং হোম টেক্সটাইল সামান্য কমেছে। তবে ওষুধ রপ্তানি বেড়েছে ১৯ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং পাট ও পাটজাত পণ্য বেড়েছে ১১ দশমিক ২০ শতাংশ। অর্থাৎ কিছু খাতে ইতিবাচক প্রবণতা থাকলেও তা মোট রপ্তানির বড় পতন ঠেকাতে যথেষ্ট নয়।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৪৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু টানা সাত মাসের পতন সেই লক্ষ্য অর্জনকে কঠিন করে তুলেছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে রপ্তানি ও রেমিট্যান্সÑ উভয় ক্ষেত্রেই চাপ বাড়তে পারে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post