ফারুক রহমান, সাতক্ষীরা: ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। সেই ক্ষতির আঁচ লেগেছে দেশের দক্ষিণের জেলা সাতক্ষীরায় অবস্থিত ভোমরা স্থলবন্দরে। কলকাতা থেকে সবচেয়ে কাছে অবস্থিত দেশের অন্যতম স্থলবন্দর ভোমরা দিয়ে প্রতিদিন শত শত ট্রাক বিভিন্ন পণ্য ভারত থেকে আমদানি হয়। বাংলাদেশ থেকেও বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হয় ভারতে। কিন্তু চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বন্দরের রাজস্ব আদায়ে।
ডিজেল সংকটে ভোমরা স্থলবন্দর থেকে পণ্য পরিবহনকরা ট্রাকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ট্রাকপ্রতি ভাড়াও বেড়েছে তিন থেকে চার হাজার টাকা। এ ছাড়া আমদানি কাঁচামাল সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় পথে নষ্ট হচ্ছে। সেইসঙ্গে পরিবহন খরচ বাড়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
পণ্য পরিবহনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ট্রাক মালিক ও চালকরা।
বন্দরে কথা হয় ট্রাকচালক আবুল হোসেন, রবিউল ইসলাম ও আমির উদ্দিনের সঙ্গে। তারা বলেন, ‘সময় ও প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় টিপ মিস হচ্ছে, আবার ভোমরা বন্দর থেকে টিপ নিয়ে ঢাকা বা চট্টগ্রাম গেলে জ্বালানির অভাবে সেখানে বসে থাকতে হচ্ছে। এর ফলে মালিক ও চালকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ট্রাকচালক রকিব উদ্দীন সরদার বলেন, ভোমরাবন্দর থেকে নারায়ণগঞ্জে পণ্য নিয়ে যাওয়ার পথে গত কয়েক দিনে আমাকে অন্তত পাঁচ-ছয়টি পাম্প ঘুরতে হয়েছে। অধিকাংশ পাম্পে তেল নেই, আবার কোথাও থাকলেও চাহিদা মতো দিচ্ছে না। ২০-৫০ লিটার করে তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে আমাদের দীর্ঘ সময় নষ্ট হচ্ছে। সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে না পারায় ব্যবসায়ীদের কথা শুনতে হচ্ছে। পথে বাড়তি খরচের কারণে আমাদের আয়েও টান পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে ট্রাক চালানোই মুশকিল হয়ে পড়বে।
আরেক ট্রাকচালক নজরুল ইসলাম বলেন, তেল সংকটের কারণে আমাদের এখন দূরের ট্রিপ নিতে ভয় হয়। আগে একবার পুরো ট্যাংকি তেল ভরে নিশ্চিন্তে গন্তব্যে চলে যেতাম। এখন অর্ধেক রাস্তা যাওয়ার পর তেল ফুরিয়ে গেলে পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে সময় নষ্ট হচ্ছে। গাড়ির মালিকরা ভাড়া বাড়াতে বলছেন। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বাড়তি ভাড়া দিতে চাচ্ছেন না। আবার সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে না পারায় ব্যবসায়ীদের কথা শুনতে হচ্ছে। জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে ট্রাকের চাকা বন্ধ রাখা ছাড়া উপায় থাকবে না।
ভোমরা স্থলবন্দরের একাধিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ী বলেন, বন্দরে এখন আর আগের মতো ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা ব্যবসায়ীদের কথা অনুযায়ী ট্রাক সরবরাহ করতে পারছি না। জ্বালানির এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে ভোমরা স্থলবন্দর থেকে সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাবে এবং ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।
সাতক্ষীরা জেলার কয়েকজন পাম্প মালিক বলেন, বিপিএসসির মাধ্যমে আরা যে জ্বালানি পাই, বর্তমানে পাম্পগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ কমে গেছে। এ কারণে আমরা গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করতে পারছি না। প্রতিদিন পাম্পে জ্বালানি সরবরাহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কখনো কখনো পুলিশ দিয়ে লাইন ম্যানেজ করতে হচ্ছে। দেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আমরাদের পক্ষে পাম্প পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে।
ভোমরা স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবু হাসান বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় ব্যবসায়ী, আমদানি রপ্তানিকারকরা। সরকার হারাচ্ছে মোটা অঙ্কের রাজস্ব।
ভোমরা স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে ট্রাকভাড়া বেড়ে যাওয়ায় বন্দরে আমদানি-রপ্তানি কমে গেছে। ট্রাক মালিক ও ড্রাইভাররা দূরপাল্লার ভাড়ায় যেতে চাইছে না। কারণ পথে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হয়রানি হতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে বন্দরে রাজস্ব আয় তলানিতে নামবে। জ্বালানি সংকটের আশু সমাধান না হলে সমস্যা আরও বাড়বে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post