অশোক দত্ত : আমনের মৌসুম ঘিরে দেশে সার সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। ডিএপি, টিএসপি ও ইউরিয়া সারের জন্য ডিলার পয়েন্ট থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে ঘুরেও চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না কৃষকরা। কোথাও কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামেও খরিদ করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন কৃষকরা।
এছাড়া রাজশাহী, কুষ্টিয়া, রংপুর ও কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় কৃষকদের কাছে জানতে চাইলে তারা অভিযোগ করেন, রসিদ না দিয়েই বেশি দামে সার বিক্রি করছে এবং ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন।
এমন পরিস্থিতিতে গত বুধবার পাবনায় বাজারে সার সংকট ও দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চরতারাপুরের কৃষকরা তাদের জমির সামনে কৃষি সরঞ্জাম রেখে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। এমনকি কয়েকদিন আগে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে ক্ষুব্ধ কৃষকেরা সারের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ পর্যন্ত করেছেন।
এ প্রসঙ্গে কৃষি উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সচিবালয়ে বলেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই, তবে কিছু অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। বিশেষ করে আরাকান থেকে সীমান্ত দিয়ে মাদক আসে, আবার এখান থেকে সার পাচার হয়। এজন্য অনেক সময় সংকটের কথা বলা হয়। এ ধরনের পাচার রোধে ইতোমধ্যে কোস্টগার্ড, বিজিবি ও নৌবাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কোনোভাবেই সারের দাম বাড়বে না। সার কারখানাগুলোয় জ্বালানির দাম বাড়লেও সেই অজুহাতে সারের দাম বাড়াবে না সরকার বলে তিনি স্পষ্ট করেন।
উপদেষ্টা আরও জানান, সারের দাম নির্ধারণ, আমদানি ও সংকট মোকাবিলাসহ সার ব্যবস্থাপনায় সরকার একটি জাতীয় সার ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটির অধীনে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। ফলে সার নিয়ে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট আর থাকবে না বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, আমন ধানের মৌসুম দেশের খাদ্য উৎপাদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ আসে এ মৌসুম থেকে। অথচ সার সংকট নিরসন না হলে উৎপাদনে বড় ধাক্কা লাগবে।
ধান চাষের মূল উপাদান সারে সংকট তৈরি হলে আমনের ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তারা সতর্ক করে বলেন, গত বছরের বন্যায় আমনের উৎপাদন কম হওয়ায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। নতুন করে সার সংকট দেখা দিলে এ বছর খাদ্যনিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে। এর প্রভাব শুধু চালের বাজারেই পড়বে না, পড়বে খাদ্যনিরাপত্তা ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে রাসায়নিক সারের চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ টন, যার ৮০ শতাংশ আমদানি নির্ভর। স্থানীয় পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে তিনটি গ্যাস সংকটে বন্ধ থাকায় উৎপাদনও কমে গেছে। ফলে আমদানি নির্ভরতা আরও বেড়েছে।
এ প্রসঙ্গে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র এক কর্মকর্তা বলেন, তবে সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে দ্রুত সার আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সেই লক্ষে গত ২৩ সেপ্টেম্বর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে রাশিয়া থেকে ৩৫ হাজার টন এমওপি, সৌদি আরব থেকে ৩০ হাজার টন ইউরিয়া আমদানি এবং কাফকো থেকে আরও ৩০ হাজার টন ইউরিয়া সার ক্রয়ের অনুমোদন দেয়া হয়। এতে ব্যয় হবে প্রায় ৪৭২ কোটি টাকা।
এ ছাড়া কৃষি মন্ত্রণালয় বেসরকারিভাবে ১৩টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ হাজার টন টিএসপি, ২ লাখ ৫৫ হাজার টন ডিএপি এবং ৯০ হাজার টন এমওপি আমদানি করবে এবং দ্বিতীয় ধাপে আরও ৯০ হাজার টন টিএসপি ও ১ লাখ ২০ হাজার টন ডিএপি আমদানিরও কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, আমদানির ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারের স্বীকৃত বুলেটিন আরগাস ও ফারটিকনের দরের ভিত্তিতে চুক্তি করা হয়। তবুও সমস্যা রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে। চীন সম্প্র্রতি স্থানীয় বাজার স্থিতিশীল রাখতে সারের রপ্তানি কমিয়ে দিয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে দামে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গত দুই মাসে ডিএপি সারের দাম বেড়েছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছে, আমদানিকৃত সার বন্দরে খালাস ও পরিবহনেও ইচ্ছাকৃত দেরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে বাজারে সরবরাহ সংকট আরও প্রকট হচ্ছে। ঠিকাদার ও ডিলারদের সিন্ডিকেটের কারণে এ অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
রাজশাহীর পুঠিয়া, মোহনপুর ও কুষ্টিয়ার ভাদালিয়া গ্রামের কৃষকেরা জানিয়েছেন, ডিলারের কাছে কার্ড দেখালেও বিঘাপ্রতি মাত্র ১০ কেজির বেশি সার মিলছে না। ফলে তাদের বাধ্য হয়ে খোলাবাজার থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। মাদারীপুরের কৃষক বাদশা হাওলাদার বলেন, দোকানে গেলে বলে ‘সার নেই’। কিন্তু বেশি দাম দিলে সহজেই পাওয়া যায়।
রংপুরের কৃষক কামরুজ্জামান বকুল বলেন, আমন ধানের পরিচর্যায় এখন সার সবচে বেশি দরকার। কিন্তু পর্যাপ্ত সার পাওয়া যাচ্ছে না। টিএসপি-ডিএপি কোনোমতে পেয়েছি, এমওপি পাইনি।
অন্যদিকে ডিলাররা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তারা বলছেন, বরাদ্দ কম থাকায় বাজারে সংকট দেখা দিয়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আমনের মৌসুমে সার সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। সরকার আমদানি প্রক্রিয়া জোরদার করলেও মাঠ পর্যায়ে কৃষককে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। আমদানিকৃত সার দ্রুত মাঠ পর্যায়ে পৌঁছাতে না পারলে আমনের উৎপাদন ব্যাহত হবে বলে ধারণা করছেন তারা।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post