রামিসা রহমান : ঈদ মানেই আনন্দ, নতুন পোশাক, কেনাকাটা আর পরিবার-পরিজনের সঙ্গে উৎসব উদ্যাপন। কিন্তু এই আনন্দঘন সময়কে পুঁজি করে প্রতি বছরই সক্রিয় হয়ে ওঠে একশ্রেণির প্রতারক চক্র। বিশেষ করে অনলাইন কেনাকাটার জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণার ঘটনাও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ঈদকে সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক দোকান, ভুয়া ই-কমার্স সাইট ও অনলাইন পেজের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
ঈদের এক থেকে দেড় মাস আগে অনলাইন প্রতারণার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। কারণ এই সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ অনলাইনে পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিক পণ্যসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র কিনতে আগ্রহী হন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব এবং দ্রুত লাভের আশায় প্রতারক চক্রের নানা কৌশলের কারণে সাধারণ ক্রেতারা সহজেই ফাঁদে পড়ছেন।
বর্তমানে বাংলাদেশের অনলাইন বাণিজ্যের বড় অংশই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক। বিশেষ করে ফেসবুক পেজের মাধ্যমে হাজার হাজার ছোট-বড় দোকান পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু এসব পেজের একটি বড় অংশের কোনো নিবন্ধন নেই এবং অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো সম্পূর্ণ ভুয়া।
ঈদকে সামনে রেখে এসব পেজে আকর্ষণীয় অফার দিয়ে ক্রেতাদের প্রলুব্ধ করা হয়। অনেক সময় ব্র্যান্ডেড পোশাক বা দামি পণ্য অস্বাভাবিক কম দামে বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। ক্রেতারা সেই বিজ্ঞাপন দেখে অগ্রিম টাকা পাঠালে পরে আর কোনো পণ্যই হাতে পান না।
প্রতারণার শিকার ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা সাদিয়া রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, ঈদের শাড়ি কেনার জন্য ফেসবুকের একটি পেজে শাড়ি অর্ডার দেই। পেজটি অগ্রিম বিকাশে টাকা পাঠাতে বলে। টাকা পাঠানোর পর কয়েকদিন যোগাযোগ করা গেলেও পরে পেজটি যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। আমি ভেবেছিলাম ভালো অফার পেয়েছি। কিন্তু পরে বুঝলাম পুরো বিষয়টাই ছিল প্রতারণা।
দক্ষিণ বনশ্রীর বাসিন্দা জেসমিন আক্তার শেয়ার বিজকে বলেন, ঈদের কেনাকাটার জন্য জন্য ফেসবুকের একটি পেজে সাত হাজার টাকা দামের একটা জামা অর্ডার দিই। পেজটি ঢাকার বাইরে হওয়ায় আগে ডেলিভারি চার্জ ১৫০ টাকা আগে পাঠাতে হয়েছে। পরে এসএম পরিবহন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে জামাটা পাঠানো হয়েছে। কিন্তু যখন জামাটা পাই তখন দেখি সাত হাজার টাকার জামার জায়গায় ৪০০ টাকার একটি বাটিকের জামা দেওয়া হয়েছে। তাদের বিষয়টা জানানো হলে আমাকে সঙ্গে সঙ্গে তারা ব্লক করে দেয়।
শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, অনেক প্রতারক চক্র ভুয়া ই-কমার্স ওয়েবসাইট তৈরি করেও প্রতারণা করছে। এসব ওয়েবসাইট দেখতে অনেক সময় বড় প্রতিষ্ঠানের মতোই পেশাদার মনে হয়। ওয়েবসাইটে বিভিন্ন পণ্যের আকর্ষণীয় ছবি, বড় ছাড়ের অফার এবং দ্রুত ডেলিভারির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু ক্রেতা টাকা পরিশোধ করার পর পণ্য আর পৌঁছায় না।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক সময় এসব ওয়েবসাইটের ডোমেইন নাম বড় ব্র্যান্ডের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করা হয়, যাতে ক্রেতারা সহজে বিভ্রান্ত হন।
অনলাইন প্রতারণার আরেকটি সাধারণ কৌশল হলো ভিন্ন পণ্য পাঠানো। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতারা যে পণ্য অর্ডার করেন, তার বদলে নিম্নমানের বা সম্পূর্ণ ভিন্ন পণ্য হাতে পান। ঈদের পোশাকের ক্ষেত্রে এই ধরনের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। অনলাইনে যে পোশাকের ছবি দেখে অর্ডার করা হয়, ডেলিভারির সময় দেখা যায় পণ্যের মান অত্যন্ত নিম্নমানের। অনেক ক্ষেত্রে ফেরত দেওয়ার সুযোগও থাকে না।
অনলাইন কেনাকাটায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে অগ্রিম পেমেন্ট। অনেক প্রতারক প্রতিষ্ঠান শুধু অগ্রিম টাকা নেওয়ার জন্যই ভুয়া দোকান চালু করে। অগ্রিম টাকা পাওয়ার পর তারা ক্রেতার ফোন ধরা বা পেজটি বন্ধ করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রতারকরা নতুন নামে আবার নতুন পেজ খুলে একই ধরনের প্রতারণা চালিয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঈদের সময় মানুষের কেনাকাটার চাপ অনেক বেশি থাকে। সময়ের স্বল্পতা ও দ্রুত কেনাকাটা করার প্রবণতার কারণে মানুষ অনেক সময় যাচাই-বাছাই না করেই পণ্য অর্ডার করেন। এই সুযোগটিই কাজে লাগায় প্রতারক চক্র। এছাড়া ঈদ উপলক্ষে মেগা সেল, লাস্ট মিনিট অফার কিংবা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ের মতো প্রচারণা দিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা হয়।
তারা মনে করছেন, অনলাইন প্রতারণা প্রতিরোধে প্রযুক্তিগত নজরদারির পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। ক্রেতারা যদি সচেতন হন এবং যাচাই-বাছাই করে কেনাকাটা করেন, তাহলে প্রতারকদের সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে। প্রতারণা রোধে কঠোর নজরদারি, নিবন্ধন ব্যবস্থা জোরদার এবং সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।
অনলাইন প্রতারণা রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সক্রিয় রয়েছে। পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট এবং র্যাব নিয়মিত নজরদারি চালাচ্ছে। সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতারকরা প্রায়ই ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে এবং দ্রুত পেজ বা ওয়েবসাইট পরিবর্তন করে। ফলে তাদের শনাক্ত করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তবে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রতারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
বিশেষজ্ঞরা অনলাইন কেনাকাটায় কিছু বিষয় অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন। যেমন অচেনা ফেসবুক পেজ বা ওয়েবসাইট থেকে কেনাকাটা না করা। সম্ভব হলে ক্যাশ অন ডেলিভারি পদ্ধতি ব্যবহার করা, বিক্রেতার রিভিউ ও আগের ক্রেতাদের মন্তব্য যাচাই করা এবং সন্দেহজনক কোনো অফার দেখলে তা এড়িয়ে চলা।
বাংলাদেশে ই-কমার্স খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। অনলাইন বাণিজ্যের মাধ্যমে হাজার হাজার উদ্যোক্তা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে পুরো খাতের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ঈদকে সামনে রেখে অনলাইন কেনাকাটায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। কোনো পণ্য কেনার আগে বিক্রেতার পরিচয়, রিভিউ এবং যোগাযোগের তথ্য যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে অস্বাভাবিক কম দামের অফার দেখলে সতর্ক থাকতে হবে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, ঈদকে সামনে রেখে অনলাইন কেনাকাটার প্রবণতা বাড়ে। এই সময়টাকে লক্ষ করে একটি প্রতারক চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পেজ খুলে আকর্ষণীয় অফার দিয়ে তারা ক্রেতাদের ফাঁদে ফেলে। তাই ভোক্তাদের সচেতন হতে হবে এবং যেকোনো অনলাইন কেনাকাটার আগে বিক্রেতার সত্যতা যাচাই করা জরুরি। পাশাপাশি এসব প্রতারণা বন্ধে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আরও কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।
অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন শেয়ার বিজকে বলেন, ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন বাণিজ্য দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু এই খাতের সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি না থাকলে প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ে। বিশেষ করে উৎসবের সময় মানুষ বেশি কেনাকাটা করে, তখন প্রতারক চক্রের সক্রিয়তা বাড়ে। তাই ই-কমার্স খাতে আস্থা ধরে রাখতে হলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।
ইনফিনিটির ব্র্যান্ডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. নাজমুল হক খান শেয়ার বিজকে বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে অনলাইন কেনাকাটায় ভুয়া অফারের প্রবণতা বাড়ে। অনেক সময় আমাদের ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে কম দামে পণ্য দেওয়ার কথা বলে প্রতারণা করা হয়। তাই আমরা ক্রেতাদের বলছি, শুধু অফিশিয়াল পেজ বা অনুমোদিত আউটলেট থেকেই কেনাকাটা করুন।
আড়ং ব্র্যান্ডের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাফিস সাদাত শেয়ার বিজকে বলেন, ঈদের সময় অনলাইনে কেনাকাটার চাপ অনেক বেড়ে যায়। এই সুযোগে অনেক ভুয়া পেজ বা অননুমোদিত বিক্রেতা আমাদের ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে প্রতারণা করছে। তাই ক্রেতাদের সবসময় আমাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট বা অনুমোদিত প্ল্যাটফর্ম থেকে পণ্য কেনার পরামর্শ দিচ্ছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, ইয়েলো ব্র্যান্ডের এক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের পণ্যের ছবি ব্যবহার করে অনেক ভুয়া পেজ তৈরি করা হচ্ছে। এতে ক্রেতারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। ক্রেতাদের উচিত যেকোনো অফার দেখলে আগে পেজটির সত্যতা যাচাই করা এবং অফিশিয়াল পেজ ছাড়া অন্য কোথাও অগ্রিম টাকা না দেওয়া।
ঈদ আনন্দের উৎসব। কিন্তু এই আনন্দের সময়টিকে পুঁজি করে প্রতারণার শিকার হওয়া কারও জন্যই কাম্য নয়। তাই অনলাইনে কেনাকাটা করার সময় সতর্ক থাকা এবং যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনতা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নিরাপদ ই-কমার্স ব্যবস্থার মাধ্যমে এই প্রতারণা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। তাহলেই উৎসবের আনন্দ থাকবে নির্ভেজাল ও নিরাপদ।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post