নিজস্ব প্রতিবেদক : খেজুরের বাজার অস্বস্তি বেড়েছে। রাজধানীর বাজারগুলোতে মাত্র একদিনের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের খেজুরের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের কাছে জনপ্রিয় জাহিদী খেজুরের। বাজারের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ ক্রেতারা। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। জাহিদী খেজুর ২৮০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, গতকাল তা ৩৫০ টাকায় ঠেকে। গত বছরের প্রথম রমজানে এই মানের খেজুরের দাম ছিল ২৩৩ থেকে ২৫০ টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে অন্তত ১০০ টাকা। আর ভালো মানের জাহিদী খেজুর এখন বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকায়, যা গত বছর ছিল ৩৫০ টাকা। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের কাছে জনপ্রিয় বস্তা খেজুরের দামও দুই দিনের ব্যবধানে কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে এই খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ২৮০ টাকায়, যা দুদিন আগেও ২২০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে ছিল। গত বছর এই খেজুর ১৮০ থেকে ২২০ টাকায় কিনতে পেরেছিলেন ভোক্তারা।
রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় খেজুর কিনতে আসা মোহাম্মদ বিল্লাল বলেন, গত সপ্তাহে জাহিদী খেজুর কিনেছিলাম ২৮০ টাকা কেজি দরে। গতকাল তা ৩৫০ টাকায় কিনতে হলো। এত দ্রুত দাম পরিবর্তন হলে আমাদের তো খেজুর না খেয়ে থাকতে হবে। সুন্নত হিসেবে সবাই ইফতারে কম-বেশি খেজুর রাখার চেষ্টা করে। সেটি নিয়েও যদি এমন সিন্ডিকেট হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের বলার কিছু থাকে না।’ তিনি এই বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেন।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, অন্যান্য প্রায় সব ধরনের খেজুরের দামও কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে। বর্তমান দর অনুযায়ী, সুরমা ৩৬০ থেকে ৪০০ টাকা, বরই ৪৮০ থেকে ৬৫০ টাকা, ছড়া খেজুর ৫৫৫ থেকে ৬০০ টাকা এবং দাবাস ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া সুদাই ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা, কালমি মরিয়ম ৮৫০ থেকে ৯০০, মাবরুম মরিয়ম ৮৫০ থেকে ৯৫০, সুকারি ৯২০ থেকে ৯৫০, আজওয়া ৯৫০ থেকে ১০০০, ইরানি মরিয়ম ১২৫০ থেকে ১৪০০ এবং প্রিমিয়াম মেডজুল ১৬৫০ থেকে ১৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকার খেজুর আমদানিতে শুল্ক হার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার পর আমদানি দ্রুত বেড়েছে। এ কারণে গত বছরের তুলনায় এতদিন দাম কিছুটা কম থাকলেও গত সপ্তাহ থেকে একটি গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে, থাইল্যান্ডের সাগরে বাংলাদেশ অভিমুখী ১৫০ কনটেইনার খেজুর ডুবে গেছে। ব্যবসায়ীদের একটি অংশ এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও দাম বাড়িয়ে দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডÑএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে খেজুরের চাহিদা ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টন, যার মধ্যে রমজান মাসেই প্রয়োজন হয় ৬০ থেকে ৮০ হাজার টন। বর্তমানে চাহিদার তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি খেজুর মজুত রয়েছে। অর্থাৎ সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। তা সত্ত্বেও অতি মুনাফালোভী এক শ্রেণির ব্যবসায়ীর কারসাজিতে রমজানের এই অতি জরুরি পণ্যটির দাম নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
খেজুর আমদানির পরিমাণ: গত ২৭ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৪ লাখ ৫৫ হাজার ৫৫৮ কেজি বিভিন্ন জাতের খেজুর আমদানি হয়েছে। এসব থেকে বিভিন্ন ধরনের আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট বাবদ ২১ কোটি ৩৯ লাখ ৭৮ হাজার ২৬২ টাকার রাজস্ব আদায় করেছে এনবিআরের কাস্টমস অনুবিভাগ। আয়কর অনুবিভাগ অগ্রিম আয়কর বা অ্যাডভান্সড ইনকাম ট্যাক্স (এআইটি) আদায় করেছে ২ কোটি ৯২ লাখ ৮৩ হাজার ৭২৮ টাকা।
২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯৩ হাজার ৫৫৬ মেট্রিক টন খেজুর আমদানি হয়েছে। এসব থেকে এনবিআর রাজস্ব আদায় করেছে ৭১৮ কোটি ৮৩ লাখ ২১ হাজার ৫৭৭ টাকা। এর মধ্যে কাস্টমস ডিউটি (সিডি) ২৮৯ কোটি ৬১ লাখ ৩৯ হাজার ৫৪৭ টাকা। রেগুলেটরি ডিউটি (আরডি) ৫২ কোটি ৩৮ লাখ ১৬ হাজার ২১৬ টাকা। মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ৩১৩ কোটি ২০ লাখ ৭৪ হাজার ৯৫৯ টাকা। অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ৬৩ কোটি ৬২ লাখ ৯০ হাজার ৭৫৫ টাকা। আগের বছর ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি হয়েছিল ১৩ হাজার ৪৬৬ মেট্রিক টন। ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭৫ হাজার ৮৫১ মেট্রিক টন খেজুর আমদানি হয়েছে। ফলটি আমদানি করতে চার ধরনের শুল্ক, ভ্যাট ও আয়কর দিতে হয়। ৪৫৭ টাকা ৫০ পয়সার এক কেজি খেজুর আমদানি পর্যায়ে সরকার কর বাবদ ১৮৬ টাকা ১৮ পয়সা কেটে নিচ্ছে। এতে কাস্টম হাউস থেকে ছাড় পাওয়ার সময়ই সব মিলিয়ে ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ করারোপ হচ্ছে খেজুরের ওপর। করের এ ভার বহন করতে হচ্ছে ক্রেতাকে।
এনবিআরের কাস্টমস অনুবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, যেকোনো দেশ থেকে আজওয়া, মেডজুল, আম্বার/আনবারা ও মাবরুম নামের প্রতি কেজি খেজুর আমদানি করতে শুল্কায়ন মূল্য ৩ ডলার ৭৫ সেন্ট বা ৪৫৭ টাকা ৫০ পয়সা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা)। এর সঙ্গে যোগ হয় শুল্কায়ন মূল্যের ওপর শুল্ক বা কাস্টমস ডিউটি ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ ৬৮ টাকা ৬২ পয়সা; আরডি ৩ শতাংশ বা ১৩ টাকা ৭২ পয়সা; শুল্কায়ন মূল্যের সঙ্গে সিডি ও আরডির যোগফল ৫৩৯ টাকা ৮৪ পয়সার ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ বা ৮০ টাকা ৯৭ পয়সা এবং শুল্কায়ন মূল্যের ওপর এআইটি ৫ শতাংশ বা ২২ টাকা ৮৭ পয়সা। অর্থাৎ আজওয়া, মেডজুল, আম্বার/আনবারা ও মাবরুম প্রতি কেজি খেজুর আমদানি করতে সব মিলিয়ে শুল্ক ও কর দিতে হয় ১৮৬ টাকা ১৮ পয়সা। আর এ চার ধরনের খেজুর প্রতি কেজির কাস্টমস হাউস পর্যায়ে খরচ পড়ছে ৬৪৩ টাকা ৬৮ পয়সা।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post