আনোয়ার হোসাইন সোহেল: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের কোম্পানি সিকদার ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে বীমা আইন লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কোম্পানিটির ১২ জন পরিচালকের মধ্যে ৯ জনই একই পরিবারের সদস্য; যা বিদ্যমান বীমা আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বীমা কোম্পানিটিতে প্রয়াত জয়নুল হক সিকদারের কন্যা নাসিম হক সিকদার চেয়ারপারসন এবং পুত্র মমতাজুল হক সিকদার ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া পরিচালক হিসেবে রয়েছেন পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য। তারা হলেন— নাতনি লিজা ফাতেমা সিকদার, মনিকা সিকদার খান, জেফরি খান সিকদার, জোনাস খান সিকদার, নাতনি মন্ডি খান সিকদার, নাতিন জামাই সালাউদ্দিন খান ও নাতি মোহতাসিম বিল্লাহ খান। কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে তারাই প্রাধান্য বিস্তার করে আছেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ২০১৬ সালের সার্কুলার অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা তার পরিবারের সদস্যরা সম্মিলিতভাবে একটি বীমা কোম্পানির ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারবেন না। এছাড়া প্রত্যেক উদ্যোক্তা পরিচালকের ন্যূনতম শেয়ারধারণের হার ২ শতাংশ নির্ধারিত।
সে হিসাবে ৯ পরিচালক যদি ন্যূনতম ২ শতাংশ করে শেয়ার ধারণ করেন, তাহলে তাদের সম্মিলিত শেয়ার দাঁড়ায় ১৮ শতাংশ; যা নির্ধারিত সীমার স্পষ্ট লঙ্ঘন ।
এ বিষয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি শেয়ার বিজকে বলেন, “বিদ্যামান বীমা আইনে কোনো বীমা কোম্পানির পরিচালকরা সম্মিলিতভাবে ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারেন না। এককভাবে প্রত্যেক পরিচালক সর্বনিম্ন ২ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে পারেন। সে হিসাবে আইন অনুযায়ী বীমা কোম্পানিটিতে একসঙ্গে একই পরিবারের এত সদস্য পরিচালনা পর্ষদে কোনোভাবেই থাকতে পারেন না। যদি কোনো বীমা কোম্পানিতে এই ধরনের পরিচালকরা থাকেন তাহলে আইডিআরএ কর্তৃপক্ষ এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।’
এদিকে ডিএসইর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সিকদার ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিটির গত সাড়ে পাঁচ মাসে শেয়ারদর বেড়েছে প্রায় ১০৭ শতাংশ। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৩ মে পর্যন্ত শেয়ারপ্রতি দাম বেড়েছে ১৯ টাকা ৯০ পয়সা। সর্বশেষ গতকাল বুধবার কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ৩ টাকা ৪০ পয়সা বা ৯.৬৯ শতাংশ। ৬ এপ্রিল থেকে টানা ঊর্ধ্বমুখী কোম্পানিটির শেয়ারদর বৃদ্ধির কারণ জানতে চেয়ে গত ৬ মে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) বীমা কোম্পানিটিকে চিঠি দেয়। জবাবে কোম্পানি জানায়, কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই শেয়ারদর বাড়ছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোম্পানিটির পেশাদার ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়েছে এবং অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতার অভাব দেখা যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে আইপিওর মাধ্যমে তোলা ১৬ কোটি টাকা ‘অযৌক্তিকভাবে’ ব্যবহার করা হয়েছে।
সিকদার পরিবারের আর্থিক অনিয়ম ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল আদালতের নির্দেশে পরিবারটির স্বার্থসংশ্লিষ্ট ১৮৯টি দেশীয় ও ১৪টি বিদেশি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বীমা কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের প্রায় সবাই বিদেশে পলাতক রয়েছেন। আইনগত ঝামেলা এড়াতে তারা মিডিয়ার সামনে আসছেন না। দীর্ঘদিন অংশ নিচ্ছেন না বীমা কোম্পানির বোর্ড মিটিংয়েও; যা বীমা আইনের লঙ্ঘন ।
কোম্পানির সচিব আব্দুর রাজ্জাক শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি, পূর্বের আইনগত বিষয় সম্পর্কে এখনো অবগত নই। এ সময় পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের এত সদস্য সম্পর্কে জানাতে চাইলে তিনি বলেন, পর্ষদের সদস্যরা যদি কোনো আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে থাকেন তাহলে পরিচালনা পর্ষদ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তবে শেয়ারদরের গত পাঁচ মাস ধরে অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে তিনি কিছু জানে না বলেও জানান । ‘
২০২৪ সালের ২৪ জানুয়ারি আইপিও সম্পন্ন করার পর কোম্পানিটি পুঁজিবাজারে লেনদেন শুরু করে। ডিএসইতে এর ট্রেডিং কোড ‘এসআইসিএল’ এবং কোম্পানিটি বর্তমানে ‘বি’ ক্যাটেগরিতে লেনদেন করছে।
সবশেষ ডিএসইর তথ্য মতে, বর্তমানে কোম্পানিটির উদ্যোক্তা বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ৫০ দশমিক ৪০ শতাংশ। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী রয়েছেন ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ৪৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।
২০২৪ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিকদার ইন্স্যুরেন্সের অনুমোদিত মূলধন ৫০ কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ৪০ কোটি টাকা। রিজার্ভে রয়েছে ৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। মোট শেয়ার সংখ্যা ৪ কোটি।
আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে, সর্বশেষ ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত
1
২০২৫ হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে (জানুয়ারি- সেপ্টেম্বর) সিকদার ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৬৩ পয়সা, আগের হিসাব বছরের একই প্রান্তিকে যা ছিল ৭৭ পয়সা (পুনর্মূল্যায়িত)। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ১০ টাকা ৩৫ পয়সায়। ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০২৪ হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে কোম্পানিটির পর্ষদ আলোচ্য হিসাব বছরে সিকদার ইন্স্যুরেন্সের ইপিএস হয়েছে ১ টাকা ২৮ পয়সা, আগের হিসাব বছরে যা ছিল ৮২ পয়সা (পুনর্মূল্যায়িত)। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ শেষে কোম্পানিটির এনএভিপিএস দাঁড়িয়েছে ১২ টাকা ২৮ পয়সায় । ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০২৩ হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের ৩ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে কোম্পানিটির পর্ষদ 1 আলোচ্য হিসাব বছরে সিকদার ইন্স্যুরেন্সের ইপিএস হয়েছে ১ টাকা ৩৪ পয়সা, আগের হিসাব বছরে যা ছিল ১ টাকা ২২ পয়সা। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩ শেষে কোম্পানিটির এসএভিপিএস দাঁড়িয়েছে ৩০ টাকা ৪৯ পয়সায়।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post