নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি : তথ্য জালিয়াতি ও মনগড়া তথ্য প্রদানের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্তি করাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে এনআরবিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজ ঘিরে তদন্ত শুরু করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বিশেষ করে নেগেটিভ ইকুইটি-সংক্রান্ত মনগড়া তথ্য জমা দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এই তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি। তাদের মনগড়া তথ্যে বিনিয়োগকারীরাও বিভ্রান্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় গত ১১ মার্চ কমিশন দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্ত কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আদেশ জারির ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে।
তদন্তের অংশ হিসেবে দেখা হবে, প্রতিষ্ঠানটি নেগেটিভ ইকুইটি বা অনির্ধারিত ক্ষতির সময়েও কোনো নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা বা বিতরণ করেছে কি না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কোনো ব্রোকারেজ হাউসের নেগেটিভ ইকুইটি থাকলে তা মার্জিন হিসাব ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয় এবং এতে ঝুঁকি বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে নগদ লভ্যাংশ দেওয়া নিয়মবিরুদ্ধ। আর বিনিয়োগকারীরা বলছেন, ব্রোকারেজ হাউসের তথ্যে স্বচ্ছতা না থাকলে বিভ্রান্ত হতে হয়। এতে বিনিয়োগে ঝুঁকি বাড়ে।
এছাড়া এনআরবিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজ নেগেটিভ ইকুইটি-সংক্রান্ত সঠিক তথ্য বিএসইসিতে জমা দেয়নিÑএমন অভিযোগও খতিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থতার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় থাকবে।
বিএসইসি সূত্রে আরও জানা যায়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে নেগেটিভ ইকুইটি থাকা বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার) হিসাব ব্যবহার করে জাঙ্ক ও জল্পনামূলক শেয়ারে লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে। পাশাপাশি নিয়ম ভেঙে ব্লক ও বাল্ক লেনদেন এবং নির্ধারিত সীমার বাইরে মার্জিন ঋণ বিতরণের অভিযোগও রয়েছে।
তদন্ত কমিটি খতিয়ে দেখবে, নেগেটিভ ইকুইটি থাকা হিসাবগুলো ব্যবহার করে কোনো কেনাবেচা, আইপিও আবেদন বা পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে কি না। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের সম্মতি ছাড়াই মার্জিন হিসাব খোলা হয়েছে কি নাÑএ বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। এ ধরনের অভিযোগ ইতোমধ্যে বেশ কিছু গ্রাহক তুলেছেন।
এছাড়া প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব ও সংশ্লিষ্টতা নিয়েও তদন্ত করা হবে।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ড. মোহাম্মদ তৌহিদুল আলম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা যা কিছু করেছি নিয়ম মেনে করেছি, নিয়মের বাহিরে কিছু করিনি।’
এদিকে আইনে না থাকলেও সাতজন স্বতন্ত্র পরিচালক দিয়ে গঠন করা হয়েছে পুঁজিবাজারের তারিকাভুক্ত এনআরবিসি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন থাকলেও তা নেওয়া হয়নি।
জানা গেছে, প্রকৃত শেয়ারধারীদের বাইরে রেখে এই স্বতন্ত্র পরিচালকরা চতুর্থ প্রজেক্টের ব্যাংকগুলোর মধ্যে শীর্ষ স্থানীয় এই ব্যাংকটিকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিতে উঠে পড়ে লেগেছেন। এদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদুল আলম খান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল তৎপর হয়ে পড়ে অভ্যুত্থানের স্পিরিট কীভাবে ভূলুণ্ঠিত করা যায়। সংস্কারের নামে কেউ কেউ নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত ছিলেন, কেউবা সততার ছদ্মবেশে নিজের স্বার্থে জনগণের বৃহত্তর স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেননি। রাষ্ট্রের বাকবদলের এই ইতিহাসে এমনই এক পথহারা পথিক হতে চলেছে দেশের আর্থিক খাত। যার জ্বলন্ত উদাহরণ এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসি। প্রকৃত বিনিয়োগকারী বা শেয়ারহোল্ডারদের বাইরে রেখে শুদ্ধতার নামে ব্যাংকটিকে ধ্বংসের শেষ বিন্দুতে নিয়ে গিয়ে কম মূল্যে কীভাবে ব্যাংকটিকে দখলদারদের হাতে তুলে দেওয়া যায়। সেই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের গিনিপিগে পরিণত হয়েছে এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসি।
সুশাসন প্রতিষ্ঠার নামে পরিচালনা পর্ষদে যাদের বসানো হয়েছিল তারাই এখন নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক আবুল বশর এনআরবিসি ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই বোর্ডের চেয়ারম্যান ও এমডির অনৈতিক কাজের সুযোগ নেওয়া শুরু করেন। এনআরবিসি ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান এনআরবিসি সিকিউরিটিজের চেয়ারম্যানের পদ বাগিয়ে নেন আবুল বশর। সিকিউরিটিজ থেকে প্রতি মাসে গাড়ির অ্যালাউন্স হিসেবে নিচ্ছেন এক লাখ টাকা। এছাড়া চট্টগ্রামের বাসিন্দা আবুল বশর ঢাকায় এলেই পরিবার নিয়ে ব্যাংকের টাকায় থাকছেন পাঁচ তারকা হোটেলে। এছাড়া স্বতন্ত্র পরিচালকরা নানা অজুহাতে ব্যাংক থেকে বিভিন্ন ভাতার নামে অর্থ নিচ্ছেন। প্রতি সপ্তাহে বোর্ড মিটিং করে আগের ১০ হাজার টাকার পরিবর্তে ৩০ হাজার টাকা সম্মানী ভাতা নিয়েছেন। বিষয়টি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়লে ভাতা কমিয়ে আবার আগেরটাই নির্ধারণ করা হয়।
এর আগেও বিভিন্ন অনিয়মের কারণে এনআরবিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজকে সতর্কবার্তা ও জরিমানা করেছে বিএসইসি। ২০২৪ সালের অক্টোবরে গ্রাহক হিসাবের ৬২ কোটি ৭৬ লাখ টাকার ঘাটতির জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা করা হয়। এর আগে ২০২২ সালেও একটি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানিটিকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post