মাহমুদুল হক আনসারী: সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আইনশৃঙ্খলার ক্রমেই অবনতি। নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি জনমনে শঙ্কা বাড়াচ্ছে। আশক্সক্ষাজনক হারে কিশোর অপরাধ কিশোর গ্যাং পরিস্থিতি অবনতি হচ্ছে। চট্টগ্রামের আকবরশাহ থানা, পাহাড়তলি থানা, হাটহাজারি উপজেলা, বাঁশখালী উপজেলা, আনোয়ারা উপজেলায়সহ সারা দেশে এই কয়েক দিনে বহু কিশোর অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। সম্প্রতি চকবাজার এলাকায় একজন কলেজছাত্রকে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা নির্মমভাবে মেরে ফেলেছে। এই ঘটনায় এলাকা ও তার পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এ ধরনের বহু ঘটনা সারা দেশে ছাত্র যুবকদের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিদিন নগরব্যাপী এবং গাঁ ও গ্রামে এ জাতীয় অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।
কথা হচ্ছে এ ধরনের অনৈতিক সমাজ বিরোধী পরিবার ও রাষ্ট্রবিরোধী আইনশৃঙ্খলা পরিপন্থি কিশোর অপরাধ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব ঘটনায় সমাজের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তাদের নিয়ন্ত্রণ এবং সংশোধনের কর্মসূচি দেখা যাচ্ছে না। ফলে অনিয়ন্ত্রিত এই কিশোর গ্যাংকে সংশোধনের কোনো বাস্তব সুফল জনগণ দেখছে না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে যাচ্ছে মসজিদের ইমাম তার মেয়েকে ঘরের মধ্যে নিরাপদে রাখতে পারছে না। ঢাকায় ঘটে গেল অপহরণ। এই ধরনের ঘটনা দেশবাসীকে কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে সেটি এখনো পরিষ্কার করতে পারছি না। নতুন সরকারের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় আইনশৃৃঙ্খলা এ অবস্থার জন্য কারা দায়ী সেটিও এই মুহূর্তে হিসাব করতে পারছি না।
কিশোর গ্যাং সমাজে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা বাড়াচ্ছে। কিশোর গ্যাং নিয়ে অনেক লেখালেখি পত্রিকাতে প্রতিদিন ছাপা হচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত কিশোর গ্যাং এখন ছড়িয়ে পড়ছে। পাড়া-মহল্লায় অলিতে-গলিতে তাদের উৎপাত চোখে পড়ছে। সাতজন এগারোজন সংখ্যায় এমন ধরনের গ্যাং পার্টি দেখতে পাওয়া যায়। এসব গ্যাং এ শিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত সামান্য পড়ালেখা জানা যুবকদেরও দেখা যায়। এসব গ্যাংয়ের মধ্যে চারিত্রিকভাবে অত্যন্ত খারাপ প্রকৃতির যুবকদের বেশি দেখা যায়। তারা সমাজের নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের কারণে চরিত্রবান শান্ত সুশৃঙ্খল যুবকরা সমাজে চলতে ফেরতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। এসব গ্যাং পার্টির অত্যাচারে প্রতিনিয়ত হয়রানি ও মানহানির শিকার হচ্ছে সহজ সরল শিক্ষার্থীরা।
স্কুল পড়ুয়া যুবক-যুবতীরা রাস্তায় চলাচলের সময় ইভটিজিংয়ের শিকার হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিকট অভিযোগ দেওয়ার মতো সাহসও অনেকেই রাখে না। এসব গ্যাংয়ের মধ্যে বিভিন্ন প্রকৃতির যুবকের সমাবেশ। তারা ছোটখাটো চুরি, জমি, বাড়িভিটা দখল কাউকে অপমান অপদস্ত করাসহ নানা কাজে জড়িয়ে পড়ে। তাদের সমাজের একশ্রেণির মোড়ল বা রাজনৈতিক নেতারা ব্যবহার করছে। বাস্তবে তাদের মধ্যে প্রকৃতভাবে রাজনৈতিক কোনো পরিচয় পাওয়া যায় না। তাদেরও কোনো দল রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে গ্রহণ করতে এগিয়ে আসে না। রাজনৈতিক মাঠে তারা শুধু অর্থের বিনিময়ে ব্যবহার হয়ে থাকে। নেতার পেছনে সেøাগান দেওয়া লোকজন একত্রিত করার দায়িত্বে এসব যুবকদের পাওয়া যায়।
এভাবে করে এসব গ্যাং পার্টি সমাজে ব্যাপকভাবে বিস্তার করছে। তাদের অপরাধের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক লিডারদের ছত্রছায়া দেখা যায়। ফলে তাদের বিরুদ্ধে প্রায় ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে এগিয়ে আসলেও সঠিকভাবে এগিয়ে যেতে বাধাগ্রস্ত হয়। ভুক্তভোগী কোনো মানুষ আইনের আশ্রয়ের জন্য সাহায্য চাইলেও সময়মতো পাওয়া যায় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে উশৃঙ্খল ওই গ্যাংদের সঙ্গে কোনো কোনো সময় একটা যোগাযোগ দেখা যায়। তারা কাউকেই পরোয়া করে না। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ঘটিয়ে পরিবারের কাছে তারা উশৃঙ্খল একজন যুবক। পরিবারের সদস্য মাতা-পিতা বড়জনদের প্রতি তাদের কোনো আনুগত্য পাওয়া যায় না। সমাজ এবং পরিবারে তারা এক আতঙ্কের নাম। মাতা-পিতা বড়জনদের সঙ্গে হরহামেশা উশৃঙ্খল আচরণ করতে দেখা যায়। কারও কোনো আদেশ নির্দেশ মানার তোয়াক্কা তাদের মধ্যে নেই।
তাদের চালচলন বেশভূষা কোনো চরিত্রের মধ্যে পড়ে না। একজন আরেকজনকে সংস্পর্শে নিয়ে ধীরে ধীরে যুবসমাজকে তারা ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে নেশার ব্যবহার, মাদক পাচার বেচা বিক্রি লক্ষ্য করা যায়। এ গ্যাং পার্টি সমাজ এবং পরিবারকে উশৃঙ্খলতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। সমাজের জন্য তারা ক্যান্সার। এসব গ্রুপে যারাই একবার ঢুকে পড়েছে তারা আর বের হওয়ার দরজা পাচ্ছে না। একদিনেই এসব গ্রুপের সৃষ্টি হয়নি। নানা কারণে অকারণে সুযোগ বুঝে পরিবারের আশ্রয় প্রশ্রয়ের তাদের সৃষ্টি। অতি আদর অতি যত্ন ভালোবাসার ফসল এসব গ্রুপ। কিশোর গ্যাং থেকে নানা নামের গ্রুপের সৃষ্টি হচ্ছে বাংলার প্রতিটি গাঁ গ্রামে।
সমাজ বিজ্ঞানী এবং রাষ্ট্রের সুচিন্তিত বুদ্ধিজীবীদের এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত দায়িত্বশীল মানুষগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। এর সঙ্গে পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা কম্পলসারি কারার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তারা যেভাবে সমাজকে ধীরে ধীরে কলুষিত করছে একদিন এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। সে সময় আশার পূর্বেই দেশের সব ধরনের ক্লাব সমিতি নিরবচ্ছিন্নভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। কোন ক্লাব কোন সমিতি কি কি কাজ করছে যুবসমাজকে কী ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রতিনিয়ত তদারকির মধ্যে রাখতে হবে। কিশোর ছাত্র, যুবক তাদের গ্রুপিং অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রেখে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পরিবার সমাজ থেকে কিশোর গ্যাং অপরাপর সব ধরনের অপরাধমূলক সংগঠনসমূহকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে হবে। রাত আটটার পর গ্রাম শহরের অলি-গলিতে আড্ডারত যুবকদের চিহ্নিত করতে হবে। এসব আড্ডা আইনের মাধ্যমে বন্ধ করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি। প্রতিটি মহল্লায় ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সর্বশ্রেণির পেশার লোকজন নিয়ে কিশোর অপরাধবিরোধী কমিটি গঠন করতে হবে।
জাতিকে আদর্শিকভাবে এগিয়ে নিতে চাইলে শিক্ষার মান, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গঠনমূলক করতে হবে। কিশোর গ্যাং তাদের অপরাধ, দেশব্যাপী অপহরণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উš্নতি বাস্তবায়ন করতে হলে সরকার জনগণ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে এখনি বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নচেৎ যেভাবে কিশোর গ্যাং পার্টি তাদের উৎপাত বৃদ্ধি করছে এবং অপহরণ সংঘাতের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাচ্ছে সেটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এখনি সেটির ইতি টানতে হবে। অন্যথায় সেটা নিয়ন্ত্রণ করা রাষ্ট্রের জন্য কঠিন হবে। সময় থাকতে পরিবার ও সমাজের শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজনৈতিক নেত্রীবৃন্দকে এগিয়ে আসার প্রত্যাশা জনগণের।
সংগঠক, গবেষক ও কলামিস্ট
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post